অনলাইন ডেস্ক : আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে একটি হাসপাতালকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ বিমান হামলার অভিযোগ ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। তালেবান সরকার দাবি করেছে, পাকিস্তানের বিমান হামলায় একটি মাদকাসক্তি চিকিৎসা কেন্দ্রে অন্তত ৪০০ জন নিহত হয়েছেন। তবে ইসলামাবাদ এই অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে, ফলে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা আরও বেড়ে গেছে।

তালেবান সরকারের উপমুখপাত্র হামদুল্লাহ ফিতরাত জানিয়েছেন, স্থানীয় সময় ১৬ মার্চ রাত ৯টার দিকে কাবুলের ওমর অ্যাডিকশন ট্রিটমেন্ট হাসপাতাল-এ এই বিমান হামলা চালানো হয়। তার দাবি, প্রায় ২ হাজার শয্যার এই বৃহৎ চিকিৎসাকেন্দ্রটির একটি বড় অংশ হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত অন্তত ৪০০ জন নিহত এবং প্রায় ২৫০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।সংবাদ বিশ্লেষণ

হামলার পরপরই ঘটনাস্থলে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। উদ্ধারকর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পাশাপাশি ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে মরদেহ উদ্ধারে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত ভিডিওতে দেখা গেছে, দমকলকর্মীরা আগুন নেভাতে প্রাণপণ চেষ্টা করছেন এবং চারদিকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী ছড়িয়ে পড়েছে।

হাসপাতালের নিরাপত্তারক্ষী ওমিদ স্টানিকজাই জানিয়েছেন, হামলার আগে আকাশে যুদ্ধবিমান টহল দিতে দেখা যায়। এরপর হঠাৎ করেই বোমা হামলা শুরু হয়, যার ফলে হাসপাতালটিতে আগুন ধরে যায় এবং দ্রুত তা ছড়িয়ে পড়ে। তার দাবি, নিহত ও আহত সবাই বেসামরিক নাগরিক, যারা চিকিৎসা নিতে সেখানে অবস্থান করছিলেন।

তালেবান সরকারের মুখপাত্র জবিউল্লাহ মুজাহিদ এই ঘটনাকে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, পাকিস্তান আবারও আফগানিস্তানের আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে এবং এই হামলা আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তালেবান প্রশাসন এই ঘটনার জন্য আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

অন্যদিকে পাকিস্তান এই অভিযোগ পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ-এর মুখপাত্র মুশাররফ জাইদি জানিয়েছেন, পাকিস্তান কোনো হাসপাতাল লক্ষ্য করে হামলা চালায়নি। পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, তাদের সামরিক অভিযান পরিচালিত হয়েছে কাবুল এবং নানগারহার প্রদেশে অবস্থিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর ঘাঁটি ও সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে। বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে প্রয়োজনীয় সতর্কতা নেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়।

এই ঘটনার পর আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্তেও উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। আফগান কর্মকর্তাদের মতে, সাম্প্রতিক গোলাগুলিতে অন্তত চারজন নিহত এবং আরও ১০ জন আহত হয়েছেন। দুই দেশের মধ্যে এই সংঘর্ষ পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে এবং নতুন করে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি করছে।

এদিকে চলমান সংঘাতের কারণে আফগানিস্তানে মানবিক সংকটও বাড়ছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, সহিংসতার ফলে ইতোমধ্যে ২০ হাজারের বেশি পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। জাতিসংঘ এসব ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য জরুরি খাদ্য সহায়তা কার্যক্রম শুরু করেছে। তবে পরিস্থিতি দ্রুত উন্নত না হলে এই সংকট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, কাবুলের এই হামলার ঘটনা শুধু একটি সামরিক বা কূটনৈতিক ইস্যু নয়—এটি মানবিক বিপর্যয়ের একটি বড় উদাহরণ হয়ে উঠেছে। অভিযোগ ও পাল্টা অস্বীকারের মধ্যে সত্যতা যাচাই এখনও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে একথা স্পষ্ট যে, এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এখন আন্তর্জাতিক মহলের নজর এই সংকটের দিকে, যাতে দ্রুত উত্তেজনা কমিয়ে একটি স্থিতিশীল সমাধান খুঁজে বের করা যায়।