Home কলাম প্রতিবাদের ভাষা

প্রতিবাদের ভাষা

বনানী বাবলি : মানুষের মত প্রকাশের মাধ্যমই হলো ভাষা । প্রাগৈতিহাসিক কালে পাথরে ছবি এঁকে মানুষের মনের ভাব প্রকাশ হওয়ার কথা আমরা জানতে পারি ইতিহাসের মাধ্যমে। যুগে যুগে মানুষের প্রতিবাদের ভাষার বৈচিত্রতা এসেছে সমাজ পরিবর্তনের সাথে সাথে কিংবা মানুষের ন্যায্য অধিকারে। একটি প্রতিবাদের ভাষা ধারণ করতে পারে ভিন্নতা ক্ষেত্র বিশেষে, কখনো বা বাক্য দিয়ে বা কখনো নীরবে, অনশনে অথবা আরো অনেক বিচিত্র উপায়ে।

ফাঁসির দড়ি গলায় লাগানোর পরেও যে ক্ষুদিরাম গান গাইতে গাইতে হেসেছিলো সেটাও ছিলো ইংরেজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। কখনো ঢাকার প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে, অথবা সেই স্বদেশী আমলে বিদেশী পণ্য পুড়িয়ে, মহাত্মা গান্ধীর দেশি সুতায় চরকায় কাপড় বুনে, বিদ্যাসাগরের নিজের ছেলেকে বিধবা বিবাহ করিয়ে, অথবা ধরা যাক ১৮০৩ সালে কেরালায় রাজা ভাঙ্কুরের আমলে স্তনকরের বিরোধিতায় নিম্নবর্ণের বা দলিত শ্রেণীর মেয়ে নাঙ্গেলির স্তন কেটে স্তনকর প্রতিবাদ, ষাটের দশকে উন্নত বিশ্বে লিঙ্গ সমতায় মেয়েদের কর্পোরেট অফিস আদালতে ছোট চুল রেখে প্রতিবাদ কিংবা মিনি স্কার্টের পরিবর্তে শার্ট প্যান্ট পরিধান করে প্রতিবাদ।

বাংলার দামাল ছেলেরা শুধু একাত্তরে নয় প্রতিবাদ করেছিলো কাগজে কলমে, মিছিলে সাম্রাজ্যবাদিতার বিরুদ্ধে, ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে মোহাম্মদ আলী জিন্নার রাষ্ট্র ভাষা উর্দুর প্রশ্নে, কিংবা সেই ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির চির তরুণদের দুর্বার আন্দোলনে, কিংবা ১৯৬৯ সালের ১১ দফা আন্দোলনের মাধ্যমে অথবা ধরা যাক স্বৈরাচারী এরশাদের মসনদকে নাড়া দেয়ার সর্বাত্মক প্রতিবাদের মাধ্যমে।

আবার হতে পারে ফেইসবুকে ছোট ছোট দুই লাইন লিখে প্রতিবাদ, গান গেয়ে প্রতিবাদ, অঙ্কনে, চিত্রকলায়, নাটক-চলচিত্রে প্রতিবাদ, কিংবা মুক্তিযুদ্ধের সময় ইয়াহিয়া খানের ভয়ংকর কার্টুন এঁকে প্রতিবাদ অথবা এই সা¤প্রতিক কালে কলেজের প্রভাষক ড: লতা সমাদ্দার ইভ টিজিংয়ের শিকার হওয়ার পর বাংলাদেশের ছেলেদের কপালে টিপ দিয়ে অন্যায়ের অভিনব ও সাহসী প্রতিবাদ। যদিও এখনো গ্রাম বাংলায় একটি শিশুর (ছেলে বা মেয়ে শিশু) জন্মের পর একটা সামাজিক প্রথা বা সংস্কার আছে যে শিশুকে যাতে অশুভ শক্তি নজর না দেয় তাই সেই শিশুকে ছোটবেলায় কপালে কালো টিপ দেওয়ার একটি প্রচলিত রীতি দেখা যায়।

অথবা বিশেষ রঙের শার্ট পরে স্কুল ছাত্রদের প্রতিবাদও হতে পারে । ২০০৭ সালে কানাডার নোভাস্কোশিয়ায় এক গ্রেড ৯ এর এক ছাত্র স্কুলের প্রথম দিন গোলাপী রঙের শার্ট পরে স্কুলে যায়। ফলস্বরূপ অন্যান্য ছেলেরা তাকে বুলিং (ইভ টিজিং) শুরু করে। এই ঘটনাটা দেখে একই স্কুলের গ্রেড ১২ এর কয়েকজন ছাত্র এবং তারা ভাবতে থাকে এই অন্যায়ের একটা উচিত জবাব চাই। তখন তারা কতগুলি গোলাপি রঙের শার্ট কিনে নিজেরা পরিধান করে এবং স্কুলের অন্যান্য ছাত্রছাত্রীরাও গোলাপি রঙের টি-শার্টে নিজেদের সাজিয়ে এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করে। এই ঘটনার পর থেকে ফেব্রুয়ারি ২৩ হলো পিঙ্ক শার্ট ডে বা অহঃর-ইঁষষুরহম উধু কানাডাতে। নর্থ আমেরিকাতে পরিবার, পোশাক শিল্প এবং সামাজিক মাধ্যমগুলিতে অলিখিতভাবে শিখানো হয় যে গোলাপী রং হলো মেয়েদের পোশাকের রং এবং ছেলেদের রং হলো নীল। এই ধারণা বহনের কারণ কী হতে পারে তা আমার অজানা। যার কারণে একটি শিশুও বড়ো হয় এই মনগড়া ধারণাটা নিয়ে এখানো পোশাকের রঙের কোনো লিঙ্গ হতে পারে না। এই ভুল ধারণাটা যাতে সমাজে ব্যাধির আকার ধারণ করতে না পারে তাই এখন গোলাপি রং এর শার্ট, টাই ইত্যাদি পরে সাধারণ মানুষ থেকে এখানকার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোও প্রতিবাদের ভাষা হিসাবে।

তাই সব শেষে বলা যায় কোনো প্রতিবাদকেই খাটো করে দেখার প্রয়াস না করাই উত্তম। প্রতিবাদ করতে দরকার হয় সমাজের তথাকথিত নিয়মের ছকের বাইরে গিয়ে এর বিপরীত হাওয়ায় দাঁড়িয়ে থাকার মতো দুঃসাহসিকতা। নির্জীব মানুষের খোলস থেকে বের হয়ে একটি ভাষায় নিজেকে তুলে ধরা। সত্যকে আলিঙ্গন করার স্পর্ধা, সত্যকে আবাহন জানানোর প্রক্রিয়া। তাই আমরা সমাজে দেখতে পাই অন্যায়কে হটিয়ে দেওয়ার অভিপ্রায়ে যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে আসে বিভিন্ন প্রতিবাদের ভাষা।

Exit mobile version