অনলাইন ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের রায়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপ করা বৈশ্বিক শুল্ক বাতিল হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অঙ্গনে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে ‘টালবাহানা’ করা দেশগুলোকে কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছেন ট্রাম্প। তার ভাষায়, আদালতের রায়কে অজুহাত বানিয়ে কেউ যদি আগের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসতে চায়, তবে তাদের ওপর আরও বেশি শুল্ক চাপানো হবে।

গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ১৯৭৭ সালের আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনের (আইইইপিএ) অধীনে ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষিত বৈশ্বিক শুল্ককে বাতিল করে। আদালত জানায়, সংশ্লিষ্ট আইন প্রেসিডেন্টকে এ ধরনের বিস্তৃত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেয় না। আমদানি পণ্যের ওপর কর হিসেবে বিবেচিত শুল্ক আরোপে কংগ্রেসের ভূমিকাই প্রাধান্য পাবে এমন ব্যাখ্যাই উঠে আসে রায়ে।

তবে রায়ের পরপরই ভিন্ন আইনি কাঠামোর আশ্রয় নেন ট্রাম্প। নতুন করে বিশ্বব্যাপী ১০ শতাংশ শুল্ক ঘোষণা করেন তিনি, যা দ্রুত ১৫ শতাংশে উন্নীত করা হয়। প্রশাসনের দাবি, এই শুল্ক ১৫০ দিনের জন্য কার্যকর থাকবে যদি না কংগ্রেস মেয়াদ বাড়ানোর পক্ষে ভোট দেয়।

শুক্রবার তিনি ‘ধারা ১২২’ প্রয়োগ করেন যা আগে কখনও ব্যবহার হয়নি। এই ধারা প্রেসিডেন্টকে সীমিত সময়ের জন্য কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই শুল্ক আরোপের সুযোগ দেয়। পাশাপাশি ‘ধারা ৩০১’ এর অধীনে তদন্ত শুরুর নির্দেশও দিয়েছেন তিনি, যা ‘অন্যায্য’ বাণিজ্য চর্চার জবাবে শুল্ক আরোপের পথ খুলে দেয়।

নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া পোস্টে ট্রাম্প সরাসরি সতর্ক করেন, যে কোনো দেশ যদি সুপ্রিম কোর্টের হাস্যকর সিদ্ধান্তকে সামনে এনে খেলতে চায়- বিশেষ করে যারা বছরের পর বছর যুক্তরাষ্ট্রকে ছিঁড়ে খেয়েছে তাদের ওপর আরও বেশি শুল্ক আরোপ করা হবে। পোস্টের শেষে তিনি লেখেন, ক্রেতা সাবধান।

ট্রাম্প যুক্তি দেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় তার কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন নেই। যদিও এই অবস্থান নিয়ে ইতোমধ্যে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান বাণিজ্য অংশীদারদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সোমবার ইউরোপীয় ইউনিয়ন জানায়, তারা গ্রীষ্মে সম্পাদিত চুক্তির অনুমোদন স্থগিত রাখবে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কমিটির সভাপতি বার্নড ল্যাঞ্জ বলেন, পরিস্থিতি এখন আগের চেয়েও বেশি অনিশ্চিত।

অন্যদিকে ভারত পূর্বনির্ধারিত আলোচনা স্থগিত করার কথা জানিয়েছে। অনেক দেশই বলছে, ট্রাম্পের প্রাথমিক ঘোষণার ভিত্তিতে যে আলোচনাগুলো এগোচ্ছিল, সেগুলোর ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত।

যুক্তরাজ্যও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। দেশটির ব্যবসা ও বাণিজ্য সচিব পিটার কাইল বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ ঘোষণা যে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে তা আমি স্বীকার করি। তিনি জানান, যুক্তরাজ্যের ব্যবসা ও জনগণের স্বার্থ রক্ষায় ‘সব বিকল্প’ বিবেচনা করা হচ্ছে।

রায়ের ফলে বাণিজ্য নীতিতে কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসবে না বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউজ। প্রশাসনের বক্তব্য, আইনি হাতিয়ার পরিবর্তন হতে পারে, কিন্তু নীতির লক্ষ্য অপরিবর্তিত থাকবে।

মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার এবিসি নিউজকে বলেন, আমরা যা করছি তা পুনর্গঠনের উপায় খুঁজে পেয়েছি। বাস্তবায়নের আইনি হাতিয়ার বদলাতে পারে, কিন্তু নীতি বদলায়নি। সিবিএস নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বলেন, হোয়াইট হাউস ইতোমধ্যে সম্পাদিত বাণিজ্য চুক্তিগুলো বহাল রাখতে চায় এবং অংশীদারদের কাছ থেকেও একই প্রত্যাশা করে।

সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার প্রায় এক শতাংশ কমেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বাণিজ্য অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। নতুন ১৫ শতাংশ শুল্ক ১৫০ দিনের জন্য কার্যকর থাকলেও, কংগ্রেসের অবস্থান পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে।

সিনেটে ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার সতর্ক করে বলেছেন, ডেমোক্র্যাটরা শুল্ক বৃদ্ধির যেকোনো প্রচেষ্টার বিরোধিতা করবে। তার ভাষায়, ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের অর্থনৈতিক ধ্বংসযজ্ঞকে আরও এগিয়ে নিতে রাজি হবে না। এমনকি কিছু রিপাবলিকানও নতুন শুল্ক আরোপ নিয়ে অস্বস্তি প্রকাশ করেছেন।