Home আন্তর্জাতিক ভেনেজুয়েলার পর ট্রাম্পের নজরে আরও পাঁচ দেশ

ভেনেজুয়েলার পর ট্রাম্পের নজরে আরও পাঁচ দেশ

অনলাইন ডেস্ক : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ গড়ে উঠছে তার পররাষ্ট্রনীতির উচ্চাকাঙ্ক্ষা ঘিরে। একটি নাটকীয় রাতের অভিযানে কারাকাসের শক্তিশালী সুরক্ষিত কম্পাউন্ড থেকে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করে তিনি ভেনেজুয়েলাকে নিয়ে হুমকি বাস্তবায়ন করেছেন।

অভিযানটি বর্ণনা করতে গিয়ে ট্রাম্প তুলে ধরেন ১৮২৩ সালের মনরো ডকট্রিন এবং পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন আধিপত্যের প্রতিশ্রুতি—যেটিকে তিনি নতুন করে নাম দেন ডনরো ডকট্রিন।

গত কয়েক দিনে ওয়াশিংটনের প্রভাব বলয়ের অন্যান্য দেশকে নিয়ে তিনি যে সতর্কবার্তা দিয়েছেন, তার কিছু এখানে তুলে ধরা হলো।

• গ্রিনল্যান্ড
এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে গ্রিনল্যান্ডে—পিটুফিক স্পেস বেস। কিন্তু ট্রাম্প চান পুরো দ্বীপটি। ‌‌‘‘জাতীয় নিরাপত্তার দিক থেকে আমাদের গ্রিনল্যান্ড দরকার,’’ সাংবাদিকদের বলেন তিনি। ওই অঞ্চল ‘‘রুশ ও চীনা জাহাজে ভরে গেছে’’ বলে দাবি করেছেন তিনি।

ডেনমার্কের অংশ ও বিশালাকৃতির এই আর্কটিক দ্বীপটি যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্বে প্রায় ৩ হাজার ২০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এটি বিরল খনিজে সমৃদ্ধ; যা স্মার্টফোন, বৈদ্যুতিক যানবাহন ও সামরিক সরঞ্জাম তৈরিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমানে বিরল খনিজ উৎপাদনে যুক্তরাষ্ট্রকে বহুলাংশে ছাড়িয়ে গেছে চীন।

গ্রিনল্যান্ড উত্তর আটলান্টিকে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থানও দখল করে আছে; যা ক্রমবর্ধমানভাবে আর্কটিক সার্কেলে প্রবেশাধিকার দেয়। আগামী বছরগুলোতে মেরু অঞ্চলের বরফ গলতে থাকায় নতুন নৌপথ খুলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স ফ্রেডরিক নিলসেন ট্রাম্পের প্রস্তাবকে ‘কল্পনা’ বলে অভিহিত করেছেন।

‘‘আর কোনও চাপ নয়। আর কোনও ইঙ্গিত নয়। সংযুক্তির কল্পনা নয়। আমরা আলোচনায় উন্মুক্ত। আমরা সংলাপে উন্মুক্ত। তবে এটি সঠিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এবং আন্তর্জাতিক আইনকে সম্মান জানিয়ে হতে হবে,’’ বলেন তিনি।

সোমবার ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডরিকসেন বলেছেন, ট্রাম্প যখন বলেন তিনি গ্রিনল্যান্ড চান, তখন তাকে ‘‘গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া উচিত।’’ ডেনমার্কের সরকারি সম্প্রচার মাধ্যম ডিআরকে তিনি বলেন, আমি স্পষ্ট করে জানিয়েছি ডেনমার্ক রাজ্যের অবস্থান কোথায় এবং গ্রিনল্যান্ড বারবার বলেছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হতে চায় না।

ফ্রেডরিকসেন সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র আরেকটি ন্যাটো দেশকে সামরিক শক্তি দিয়ে আক্রমণ করে, তাহলে সবকিছু থেমে যাবে। তিনি বলেন, ডেনমার্কের বর্তমান অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ ইউরোপীয় সমর্থন দ্বারা সমর্থিত।

• কলম্বিয়া
ভেনেজুয়েলায় অভিযান শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোকে সতর্ক করে দিয়ে ‘‘নিজের দিকে খেয়াল’’ রাখার পরামর্শ দেন ট্রাম্প। ভেনেজুয়েলার পশ্চিম প্রতিবেশী কলম্বিয়া উল্লেখযোগ্য তেল মজুদের পাশাপাশি সোনা, রূপা, পান্না, প্লাটিনাম ও কয়লার বড় উৎপাদক।

এটি ওই অঞ্চলের মাদক ব্যবসার একটি প্রধান কেন্দ্র—বিশেষত কোকেনের ক্ষেত্রে। গত সেপ্টেম্বর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবিয়ান ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে নৌকা লক্ষ্য করে হামলা শুরু করেছে; যদিও প্রমাণ ছাড়াই দাবি করেছে যে সেগুলো মাদক বহন করছিল। এরপর থেকেই ট্রাম্প দেশটির বামপন্থি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তীব্র বিরোধে জড়িয়ে পড়েছেন।

গত অক্টোবরে পেত্রোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। তিনি কার্টেলগুলোকে বাড়তে দিচ্ছেন বলে অভিযোগ করে ওয়াশিংটন। রোববার এয়ার ফোর্স ওয়ানের বিমানে ট্রাম্প বলেন, কলম্বিয়া এক অসুস্থ মানুষের হাতে চলছে, যে কোকেন বানাতে ও তা যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি করতে পছন্দ করে।

তিনি বলেন, সে খুব বেশি দিন এটা করতে পারবে না। কলম্বিয়াকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র কোনও অভিযান চালাবে কি না—এ প্রশ্নে ট্রাম্পের জবাব ছিল, আমার কাছে ভালোই শোনাচ্ছে।

ঐতিহাসিকভাবে কলম্বিয়া মাদকবিরোধী যুদ্ধে ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ মিত্র, যা কার্টেল মোকাবিলায় প্রতি বছর শত শত মিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা পেয়ে থাকে।

• ইরান
ইরান বর্তমানে ব্যাপক সরকারবিরোধী বিক্ষোভের মুখোমুখি এবং ট্রাম্প সতর্ক করেছেন, আরও বিক্ষোভকারী নিহত হলে দেশটির কর্তৃপক্ষকে কঠোরভাবে আঘাত করা হবে।

এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, আমরা খুব ঘনিষ্ঠভাবে নজর রাখছি। যদি তারা অতীতের মতো মানুষ হত্যা শুরু করে, আমি মনে করি যুক্তরাষ্ট্র তাদের কঠোরভাবে আঘাত করবে।

তাত্ত্বিকভাবে ইরান ডনরো ডকট্রিনের আওতার বাইরে পড়ে। তবে গত বছর এর পারমাণবিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলার পর ট্রাম্প ইরানি শাসকদের বিরুদ্ধে আরও পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন।

সেই হামলা হয়েছিল ইসরায়েলের বৃহৎ অভিযানের পর, যা ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা ধ্বংসের লক্ষ্যে চালানো হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত ১২ দিনের ইসরায়েল-ইরান সংঘাতে গড়ায়।

গত সপ্তাহে মার-এ-লাগোতে ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর বৈঠকে ইরান ছিল আলোচনার শীর্ষে। মার্কিন গণমাধ্যম বলছে, নেতানিয়াহু ২০২৬ সালে ইরানকে লক্ষ্য করে নতুন হামলার সম্ভাবনা উত্থাপন করেছেন।

• মেক্সিকো
২০১৬ সালে ক্ষমতায় আসার সময় ট্রাম্পের প্রচারণার মূল স্লোগান ছিল মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ। ২০২৫ সালে প্রেসিডেন্টের অফিসে ফেরার প্রথম দিনেই তিনি মেক্সিকো উপসাগরের নাম পরিবর্তন করে আমেরিকা উপসাগর করার নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন।

তিনি প্রায়ই দাবি করেন, মেক্সিকোর কর্তৃপক্ষ যুক্তরাষ্ট্রে মাদক বা অবৈধ অভিবাসী প্রবাহ ঠেকাতে যথেষ্ট করছে না। রোববার তিনি বলেন, মেক্সিকো দিয়ে মাদক উপচে পড়ছে এবং আমাদের কিছু করতে হবে। সেখানকার কার্টেলগুলো খুব শক্তিশালী।

মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাম প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কোনও সামরিক পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছেন।

• কিউবা
ফ্লোরিডার মাত্র ৯০ মাইল (১৪৫ কিলোমিটার) দক্ষিণে অবস্থিত দ্বীপরাষ্ট্রটি ১৯৬০-এর দশকের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। এটি নিকোলাস মাদুরোর ভেনেজুয়েলার ঘনিষ্ঠ মিত্র।

রোববার ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই। কারণ কিউবা পতনের মুখে। তিনি বলেন, আমার মনে হয় আমাদের কোনও পদক্ষেপ নিতে হবে না। দেখে মনে হচ্ছে এটি ভেঙে পড়ছে।

‘‘আমি জানি না তারা টিকে থাকবে কি না, তবে এখন কিউবার কোনও আয় নেই। তারা সব আয় পেতো ভেনেজুয়েলা থেকে, ভেনেজুয়েলার তেল থেকে।’’

ভেনেজুয়েলা প্রায় ৩০ শতাংশ তেল কিউবায় সরবরাহ করে বলে জানা যায়, যা মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হলে হাভানাকে বিপদে ফেলতে পারে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও—যিনি কিউবান অভিবাসীদের সন্তান—দীর্ঘদিন ধরে কিউবায় শাসন পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়ে আসছেন।

শনিবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, যদি আমি হাভানায় থাকতাম এবং সরকারের অংশ হতাম, আমি অন্তত কিছুটা উদ্বিগ্ন হতাম। যখন প্রেসিডেন্ট কথা বলেন, আপনাকে তা গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। বিবিসি বাংলা।