Home আন্তর্জাতিক যুদ্ধের মধ্যেও প্রতিদিন যেভাবে ১৩৯ মিলিয়ন ডলার আয় করছে ইরান

যুদ্ধের মধ্যেও প্রতিদিন যেভাবে ১৩৯ মিলিয়ন ডলার আয় করছে ইরান

অনলাইন ডেস্ক : হরমুজ প্রণালি ঘিরে যুদ্ধের অস্থিরতায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ধাক্কা লাগলেও, সেই পরিস্থিতিকেই নিজেদের পক্ষে কাজে লাগাচ্ছে ইরান। তেলের দাম বাড়া ও রপ্তানি চালু রাখতে পারার সুযোগে দেশটি প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অর্থ আয় করছে। আর এটি যুদ্ধের মধ্যেও তাদের অর্থনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী রাখছে।

সংবাদমাধ্যসম এনডিটিভি বলছে, হরমুজ প্রণালি সংকটের মধ্যেই তেল বিক্রি থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ আয় করছে ইরান। এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশটি অতিরিক্ত প্রায় দেড়শো মিলিয়ন ডলার আয় করেছে। সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম বাড়লেও, হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করতে পারা একমাত্র বড় রপ্তানিকারক হিসেবে ইরান এই পরিস্থিতি থেকে লাভবান হচ্ছে।

মূলত যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান দুইভাবে সুবিধা পাচ্ছে। একদিকে তাদের প্রধান তেল ‘ইরানিয়ান লাইট’ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ‘ব্রেন্ট’ তেলের তুলনায় গত ১০ মাসের মধ্যে সবচেয়ে কম ছাড়ে বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে ব্রেন্ট তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে।

এই মাসে ইরানের তেল রপ্তানি দৈনিক প্রায় ১৬ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে, এটি যুদ্ধের আগের স্তরের কাছাকাছি। তেলবাহী জাহাজগুলো খার্গ দ্বীপ টার্মিনাল থেকে তেল নিয়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পারস্য উপসাগর ছাড়ছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে এই কার্যক্রম আরও বেড়েছে।

অন্যদিকে উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর ক্ষেত্রে কার্যত অবরোধ বজায় রয়েছে, ফলে তাদের রপ্তানি ব্যাহত হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলা চললেও, ইরান তাদের অর্থনৈতিক প্রবাহ বজায় রাখতে সক্ষম হওয়ায় সেই সামরিক চাপ অনেকটাই কম কার্যকর হয়েছে। এমনকি যুদ্ধের কারণে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র সমুদ্রপথে থাকা কিছু ইরানি তেলের ওপর সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করেছে।

কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসি’র জ্যেষ্ঠ গবেষক রিচার্ড নেফিউ অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরে ইরানবিষয়ক উপ-দূত ও নিষেধাজ্ঞা নীতির সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি বলছেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসন যেন ইরানকে তেল বিক্রি করতে উৎসাহ দিচ্ছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ছিল ইরানের তেল বিক্রি বন্ধে গুরুত্ব দেয়া।’

তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে ইরান তাদের ‘ইরানিয়ান লাইট’ তেল বিক্রি করে প্রতিদিন প্রায় ১৩৯ মিলিয়ন ডলার করে আয় করছে, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ১১৫ মিলিয়ন ডলার।

এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট তেলের তুলনায় ইরানি তেলের মূল্যছাড় কমে ব্যারেলপ্রতি ২.১০ ডলারে নেমে এসেছে, যা প্রায় এক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। যুদ্ধের আগে এই ব্যবধান ছিল ১০ ডলারের বেশি।

উচ্চমূল্যে তেল বিক্রি ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সাম্প্রতিক হামলায় দেশটির অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অর্থনীতি পুনর্গঠনে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে পাল্টা হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্রও পুনরায় মজুদ করতে হবে।

ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্র কেবল সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে, তেল অবকাঠামো অক্ষত রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘কপার্নিকাস ব্রাউজার’-এর স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, সেখানে নিয়মিত বড় তেলবাহী জাহাজ ভিড়ছে এবং তেল লোড হচ্ছে।

এছাড়া ইরান হরমুজ প্রণালির বাইরে অবস্থিত জাস্ক টার্মিনাল থেকেও তেল পাঠাচ্ছে, যদিও সেখানে সাধারণত কম জাহাজ লোড হয়। এমনকি প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী কিছু বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে ট্রানজিট ফি বাবদ সর্বোচ্চ ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত আয় করছে ইরান।

অন্যদিকে যুদ্ধের কারণে কাতারের রাস লাফান এলএনজি স্থাপনাসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ফলে অন্য দেশগুলোর আয় ব্যাপকভাবে কমেছে। বিপরীতে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো বেশিরভাগই অক্ষত রয়েছে, যদিও গত সপ্তাহে ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে ইসরায়েলি হামলা হয়েছে। এর জবাবে ইরান উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর জ্বালানি স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালিয়েছে।

গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দেন, হরমুজ প্রণালি খুলে না দিলে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালানো হবে। পরে তিনি অবস্থান কিছুটা নরম করে তেহরানের সঙ্গে ‘ভালো ও ফলপ্রসূ আলোচনার’ কথা বলেন।

তবে ইরান জানিয়েছে, কোনও আলোচনা চলছে না এবং তারা যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করেছে। একইসঙ্গে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর হামলাও অব্যাহত রেখেছে তেহরান।

Exit mobile version