অনলাইন ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলার জবাবে ইরান পাল্টা আক্রমণ অব্যাহত রেখেছে। ক্রমবর্ধমান এই সংঘাতের প্রভাব ইতিমধ্যেই বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে দেখা দিয়েছে। জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম হু হু করে বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গ্যাস রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘কাতার এনার্জি’ সোমবার তাদের উৎপাদন কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে।
কাতার এনার্জির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সামরিক হামলার আশঙ্কায় তাদের গ্যাস স্থাপনাগুলো নিরাপত্তার স্বার্থে বন্ধ রাখা হচ্ছে। এর প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের ‘ব্রেন্ট ক্রুড’-এর দাম সাময়িকভাবে ব্যারেল প্রতি ৮২ ডলার স্পর্শ করেছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল স্থবির হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, যদি সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়, তবে তেলের দাম আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
শেয়ারবাজারেও প্রভাব পড়েছে। সোমবার সূচকগুলো কিছুটা নিম্নমুখী ছিল, তবে দিনের মাঝামাঝি নাসডাক এবং এসঅ্যান্ডপি ৫০০ (S&P 500) ক্ষতি কাটিয়ে সামান্য লাভে লেনদেন শেষ করেছে। লন্ডনের এফটিএসই ১০০ (FTSE 100) সূচক ১.২ শতাংশ পতন নিয়ে বন্ধ হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা বন্ধ থাকায় বিমান ও ব্যাংকিং খাতে বড় ক্ষতি হয়েছে। ফ্রান্সের ক্যাক-৪০ সূচক ২.২ শতাংশ এবং জার্মানির ডাক্স (DAX) সূচক ২.৬ শতাংশ পতন দেখেছে। তবে জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা খাতের শেয়ার চড়া রয়েছে।
জ্বালানি স্থাপনায় হামলার খবরও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। কাতারের রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটিতে ড্রোন হামলার পর ‘কাতারএনার্জি’ উৎপাদন স্থগিত করেছে। একই সঙ্গে দোহার মেসাইদ এলাকার বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার খবর পাওয়া গেছে। সৌদি আরবের রাস তানুরা তেল শোধনাগারও ড্রোন হামলার পর সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালী বর্তমানে কার্যত বন্ধ। যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল সীমিত। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সেন্টার জানিয়েছে, আরব উপসাগর ও ওমান উপসাগরে একাধিক নিরাপত্তা বিঘ্ন ঘটেছে। ১৫০টি তেল ট্যাঙ্কার হরমুজ প্রণালীর বাইরে নোঙর করেছে। ‘মায়েরস্ক’ গ্রুপও শিপিং রুট পরিবর্তন করেছে, যার ফলে সময় ও খরচ বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এর ফলে বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি ও সুদের হারের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে। এমএসটি মার্কি-এর জ্বালানি গবেষণা প্রধান সাউল কাভোনিক বলেন, তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে হরমুজ প্রণালী খোলার অপেক্ষা করতে হবে।
বাংলাদেশের জন্যও সতর্কবার্তা রয়েছে। দেশের গ্যাস সরবরাহে কাতারের এলএনজি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সাম্প্রতিক ড্রোন হামলার কারণে উৎপাদন বন্ধ থাকলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে এবং লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সরকার ও পেট্রোবাংলা পরিস্থিতি মনিটর করছে। মার্চের ১১টি কার্গোর মধ্যে ৯টি ইতিমধ্যেই সংঘাতপূর্ণ এলাকা পার হয়েছে। ঘাটতি মেটাতে বিকল্প উৎস খুঁজে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করাচ্ছেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও দাম নিয়ন্ত্রণে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
মুদ্রাস্ফীতি ও খাদ্য-উৎপাদন খাতেও প্রভাব পড়তে পারে। যুক্তরাজ্যের ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সুদের হার কমানোর পরিকল্পনা স্থগিত রাখতে পারে। সরাসরি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়েও প্রভাব পড়বে। এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি বাজার, শেয়ারবাজার ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সবক্ষেত্রেই সতর্ক থাকতে হবে।
সংক্ষিপ্তভাবে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত শুধুমাত্র অঞ্চলটিকে নয়, পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকেই অস্থির করেছে। তেলের দাম, গ্যাস সরবরাহ, জাহাজ চলাচল এবং শেয়ারবাজার—সবকিছুই এখন অস্থিতিশীল। বিশ্বের দেশগুলোকে সরবরাহ সুনিশ্চিত করার জন্য দ্রুত সমাধান বের করা প্রয়োজন।
তথ্যসূত্র : বিবিসি
