আল জাজিরার শ্রীনিবাসন জৈনের সাথে সজীব ওয়াজেদ জয়ের সাক্ষাৎকার

অনলাইন ডেস্ক : আলজাজিরার সিনিয়র সাংবাদিক শ্রীনিবাসন জৈনের কাছে দেয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন- তার মা শেখ হাসিনা রাজনীতি থেকে অবসর নিতে চান। যদি তিনি দেশে ফিরতেও পারেন, তিনি আর সক্রিয় রাজনীতিতে থাকবেন না। তিনি বয়স্ক। এটিই তার শেষ মেয়াদ হওয়ার কথা ছিল। তিনি অবসর নিতে চেয়েছিলেন। এটা সম্ভবত হাসিনা যুগের সমাপ্তি।

শ্রীনিবাসন জৈনের এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটি মূলত ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক সঙ্কট, আওয়ামী লীগের পতন, শেখ হাসিনার দায় ও ভবিষ্যৎ, নির্বাচন নিষেধাজ্ঞা, সহিংসতার অভিযোগ, দুর্নীতি এবং ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক টানাপড়েন- এই কয়েকটি কেন্দ্রীয় প্রশ্নকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। সাক্ষাৎকারজুড়ে জয় এক দিকে আত্মপক্ষ সমর্থন করেছেন, অন্য দিকে বারবার ‘বর্তমান সরকার’কে দায়ী করার মাধ্যমে অতীতের দায় এড়ানোর চেষ্টা করেছেন।

শ্রীনিবাসন জৈন সাক্ষাৎকারের শুরুতে জানান- ‘বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে আমাদের সিরিজের এই দ্বিতীয় পর্বে আমি ঢাকার বাইরে, ওয়াশিংটন ডিসিতে। এখানে শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ- যিনি ‘জয়’ নামে পরিচিত- বসবাস করেন। ২০২৪ সালের আগস্টে নাটকীয়ভাবে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি ঘটে; গণবিক্ষোভ তাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে। এর পর থেকে তিনি ভারতের সরকারের সুরক্ষায় নয়াদিল্লিতে রয়েছেন এবং ক্যামেরার সামনে আসেননি। তার অনেক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীও নির্বাসনে এবং টিভিতে আসতে অনিচ্ছুক। এই শূন্যতায় তার ছেলে তার মা ও দল আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রধান মুখপাত্র হিসেবে উঠে এসেছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিতে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আমি এখানে শেখ হাসিনার ছেলেকে জিজ্ঞেস করতে এসেছি- দীর্ঘদিনের দমনমূলক রাজনীতির বিরুদ্ধে যে বিপুল জনবিরোধিতা তৈরি হয়েছিল, সেখান থেকে আওয়ামী লীগ কি কোনো শিক্ষা নিয়েছে? নাকি দল ও নেতৃত্ব এখনো অস্বীকারের অবস্থায় আছে? আরো মৌলিক প্রশ্ন- বাংলাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে আওয়ামী লীগের আদৌ কি কোনো ভবিষ্যৎ আছে?’

শ্রীনিবাসন জৈন : আপনার কথা শুনলে মনে হয়, আপনার মাকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করা বিপুল জনরোষ, বহু বছরের দমন-পীড়ন যেটা রাস্তায় বিস্ফোরিত হয়েছিল- এ সবের কোনো স্বীকৃতিই যেন নেই। আপনার মায়ের সরকার সেই গণ-অভ্যুত্থান দমন করতে নির্মম চেষ্টা করেছিল, ব্যর্থ হয়েছে, তাকে দেশ ছাড়তে হয়েছে। এ সবের জন্য কোনো অনুশোচনা নেই?

সজীব ওয়াজেদ : আপনি যদি আমার অনলাইনের বক্তব্যগুলো শুনে থাকেন- আমি বারবারই বলেছি, আওয়ামী লীগ বিক্ষোভগুলো সঠিকভাবে সামলাতে পারেনি। আমাদের সরকার প্রতিবাদগুলো ভুলভাবে সামলেছে।

শ্রীনিবাসন জৈন : কিন্তু ‘ভুলভাবে সামলানো’ কি খুবই হালকা শব্দ নয়, যখন নিরাপত্তা বাহিনী, আপনার মায়ের নির্দেশে, মূলত নিরস্ত্র শত শত বিক্ষোভকারীকে হত্যা করেছে?

সজীব ওয়াজেদ : এর কোনোটাই আমার মা নির্দেশ দেননি। যদি আমার মা বিক্ষোভকারীদের হত্যা করতে রাজি হতেন, তা হলে তিনি এখনো ক্ষমতায় থাকতেন।

নিষেধাজ্ঞা ও নির্বাচন-স্বচ্ছতা

শ্রীনিবাসন জৈন : মি. ওয়াজেদ, আমাদের সাথে কথা বলার জন্য ধন্যবাদ। আপনি বলছেন, নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা অগণতান্ত্রিক ও অবৈধ। অনেক মানবাধিকার সংস্থাও বলে, রাজনৈতিক দলের ওপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা ভালো ধারণা নয়। কিন্তু এখানে কি বড় এক ধরনের রৎড়হু নেই? কারণ আপনি যখন সাজানো নির্বাচন ও অন্যায় আচরণের অভিযোগ তুলছেন, সেটাই তো বহু বছর ধরে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধেও অভিযোগ হিসেবে উঠে এসেছে।

সজীব ওয়াজেদ : হ্যাঁ, এই অভিযোগগুলো আছে। কিন্তু তথ্য দেখুন। আওয়ামী লীগ কখনো কাউকে নিষিদ্ধ করেনি, প্রথম কথা। আমরা কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করিনি। এটা ছিল আদালতের সিদ্ধান্ত, তৃতীয় পক্ষের করা আপিলের ভিত্তিতে।

শ্রীনিবাসন জৈন : ঠিক আছে।

সজীব ওয়াজেদ: যেখানে বলা হয়েছিল জামায়াতে ইসলামীর সংবিধান আমাদের সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক।

শ্রীনিবাসন জৈন : আপনি জামায়াতে ইসলামীর নিষেধাজ্ঞার কথাই বলছেন, যেটি বাংলাদেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর একটি।

সজীব ওয়াজেদ : ঠিক। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করেনি।

শ্রীনিবাসন জৈন : ঠিক আছে, আপনি কাউকে নিষিদ্ধ করেননি। কিন্তু একই সাথে, এটা বহু সূত্রের একটি, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, হাসিনা সরকারের সময় নির্বাচন কমিশনসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত দখল করা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর বলেছে, ২০২৪ সালের নির্বাচন, যেখানে আপনার মা ভূমিধস জয় পান, তা অবাধ ও সুষ্ঠু ছিল না। জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার পরিষদ বলেছে, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী জয় অনিয়ম, সহিংসতা ও নিরাপত্তা বাহিনীর ভয়ভীতি প্রদর্শনে কলুষিত। আমি আরো উদাহরণ দিতে পারি।

সজীব ওয়াজেদ : না, না, সবই শুনেছি। দেখুন, ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগেই আমাদের জরিপ, এমনকি আমেরিকানদের মতামত জরিপও দেখিয়েছিল, আওয়ামী লীগ ভূমিধস জয় পাবে। আমরা কেউই কোনো অনিয়ম চাইনি। প্রশাসনের কিছু লোক নিজেরাই এসব করেছে। আমার মা ও আমি- দলের পক্ষ থেকে, ভীষণ ক্ষুব্ধ ছিলাম। আমরা পরিচ্ছন্ন নির্বাচন চেয়েছিলাম, কারণ আমরা এমনিতেই জিতছিলাম। আমি নিজেই দলের জন্য জরিপ চালাই। আমরা ৩০০ আসনের মধ্যে ১৬০টি ‘ব্যাটলগ্রাউন্ড’ আসনে জরিপ করি। সেখানে আমাদের সর্বনিম্ন জয়ের ব্যবধান ছিল ৩০ শতাংশ। তাই কোনো কারণই ছিল না- আর ২০২৪ সালের নির্বাচনে কোনো কারচুপি হয়নি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বিরোধীরা বয়কট করেছিল।

বয়কট ও বিশ্বাসযোগ্যতা

শ্রীনিবাসন জৈন : কিন্তু বিরোধীরা তো বলছে, পরিবেশই এমন ছিল যে নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু ছিল না। সহিংসতা, নিরাপত্তা বাহিনীর ভয়ভীতি, নির্বাচন কমিশন দখলের অভিযোগ- এগুলো খুবই গুরুতর।

সজীব ওয়াজেদ : নির্বাচন কমিশন আমাদের সরকার নয়, একটি কমিটির মাধ্যমে মনোনীত ও নির্বাচিত হয়েছিল। আর এখন কী হচ্ছে দেখুন, এখন কেন একই পর্যবেক্ষকরা কিছু বলছেন না? এখন তো প্রধান একটি দল নিষিদ্ধ অবস্থায় নির্বাচন হচ্ছে। অনলাইনে পোস্টাল ব্যালট ভরার প্রমাণও বের হচ্ছে, শত শত ব্যালট।

শ্রীনিবাসন জৈন : কিছু সংস্থা নিষেধাজ্ঞা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, সমালোচনাও করেছে। কিন্তু তাতে এই সত্য বদলায় না যে, নির্বাচনের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের নিজের রেকর্ড গুরুতর অনিয়মে কলুষিত।

সজীব ওয়াজেদ : কিন্তু আমি এখান থেকে এগোতে চাই।

সহিংসতায় উসকানি

শ্রীনিবাসন জৈন : নিষেধাজ্ঞার কথায় ফিরি। কারণ সরকারের দাবি, আপনি নির্বাচনে সহিংসতায় উসকানি দিচ্ছেন। আপনি বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন হতে দেবো না; যা লাগে করব। সরকার যদি আমাদের প্রতিবাদ দমন করে, তা হলে সহিংসতা হবে, আমি সতর্ক করছি।’ আপনি কি এ কথায় অটল?

সজীব ওয়াজেদ : হ্যাঁ।

শ্রীনিবাসন জৈন : আপনি এ কথায় অটল?

সজীব ওয়াজেদ : হ্যাঁ। কাউকে কোণঠাসা করলে কী হবে? আমরা সহিংসতা চাই না। আমাদের তো প্রতিবাদও করতে দেয়া হচ্ছে না। তা হলে এখন আওয়ামী লীগ কোন সহিংসতা করছে?

শ্রীনিবাসন জৈন : আমি হুমকির কথাই বলছি।

সজীব ওয়াজেদ : আমি বলছি, কাউকে সব পথ বন্ধ করে দিলে, তখন তারা কী করবে?

শ্রীনিবাসন জৈন : একটি বিকল্প হতে পারে, আপনার সমর্থকদের বলা, উসকানি যাই হোক, সহিংস পথে যাবেন না। দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল হিসেবে আপনি তা করতে পারেন। নইলে আপনার কথাই সরকারের পক্ষে যুক্তি হয়ে যায়, তারা বলবে, ‘দেখুন, এ জন্যই আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা দরকার।’

সজীব ওয়াজেদ : তা হলে এই শাসন যা-ই করছে, তাদের সব সহিংসতা কি ঠিক?

শ্রীনিবাসন জৈন : দুটি ভুল মিলেও সঠিক হয় না।

সজীব ওয়াজেদ : গত জুলাইয়ের প্রতিবাদের পর থেকে আমাদের শত শত কর্মী নিহত হয়েছে। ত্রিশের বেশি হেফাজতে মারা গেছে। মাত্র গত সপ্তাহে আমাদের দলের এক সংখ্যালঘু হিন্দু নেতা কারাগারে নিহত হয়েছেন। আপনি বলেন দুই ভুলে ঠিক হয় না। কিন্তু কাউকে বল প্রয়োগে দমন করলে, অন্য কোনো পথ না রাখলে, কী হবে?

সহিংসতার দায়

শ্রীনিবাসন জৈন : কিন্তু এই ধরনের বক্তব্য দিয়ে আপনি কি আসলে এই ধারণাকেই সমর্থন দিচ্ছেন না যে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ার যোগ্য? কারণ আপনি বলছেন, ‘আমাদের নামতে দিন, নইলে সহিংসতা হবে।’

সজীব ওয়াজেদ : আমি সহিংসতার হুমকি দিইনি। আমি বলেছি, প্রতিবাদ সহিংসভাবে দমন করলে সহিংসতা হবে। আমি কাউকে আক্রমণ করতে বলিনি।

শ্রীনিবাসন জৈন : শব্দের খুঁটিনাটিতে যাচ্ছেন আপনি। কিন্তু আপনি যখন বলেন এখন পর্যন্ত কোনো সহিংসতা হয়নি, বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ বলছে তা সত্য নয়। তারা বলছে, ঢাকায় প্রচারণার সময় যুব নেতা শরিফ ওসমান হাদি হত্যার পেছনে আওয়ামী লীগ জড়িত। এটা কি সত্য?

সজীব ওয়াজেদ : অবশ্যই নয়। যদি এখন আমাদের সেই ক্ষমতা থাকত, আপনি কি মনে করেন এই শাসন টিকে থাকত? না। এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগের কাছে সেই ধরনের সহিংস জনবল নেই, যা হয়তো অন্যদের আছে।

ছাত্র সংগঠন সংক্রান্ত অভিযোগ

শ্রীনিবাসন জৈন : কিন্তু ঢাকার পুলিশ তা মানছে না। তারা বলেছে, গুলিবর্ষণকারী আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের সাথে সরাসরি যুক্ত। হাদি আপনার দলের কড়া সমালোচক ছিলেন বলেই তাকে হত্যা করা হয়েছে, রাজনৈতিক প্রতিশোধ হিসেবে।

সজীব ওয়াজেদ : আমি জানি না শুটার কে। অনেক নাম ভেসে বেড়াচ্ছে, অনেকেরই এর সাথে কোনো সম্পর্ক নেই। আমাদের ছাত্র সংগঠনের সাথে তখন বহু তরুণ জড়িত ছিল, বিশেষ করে আমরা সরকারে থাকাকালে। সে আদৌ জড়িত ছিল কি না, কতটা ছিল, কোনো পদ ছিল কি না, সব কিছুর দায় আওয়ামী লীগের ঘাড়ে চাপানো হচ্ছে।

শ্রীনিবাসন জৈন : কিন্তু এক দিকে আপনি সহিংসতার সম্ভাবনার কথা বলছেন, আর অন্য দিকে বাস্তবেই একটি সহিংস ঘটনা ঘটছে, এটা কি যুক্তিসংগত অনুমান নয়?

সজীব ওয়াজেদ : আমি যে সহিংসতার কথা বলছি, তা প্রতিবাদ থেকে আসতে পারে।

শ্রীনিবাসন জৈন : তাই তো সূত্রগুলো জুড়ে যায়।

সজীব ওয়াজেদ : না, আমি তা দেখি না। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগকে কি রাস্তায় দেখা যাচ্ছে? না। আমাদের দশ হাজারের বেশি মানুষ কারাগারে। প্রতিবাদ করলেই সবাইকে গ্রেফতার করা হয়। তাই আওয়ামী লীগ কোনো সহিংসতায় জড়িত নয়। এখন আমাদের প্রচার হলো, এই সাজানো নির্বাচনে ভোট না দিতে বলা।

অনুশোচনা ও নির্দেশ

শ্রীনিবাসন জৈন : একটা প্রশ্ন করি। আপনার কথা শুনে মনে হয়, আপনার মাকে ক্ষমতা থেকে নামানো বিপুল জনরোষ ও দীর্ঘ দমন-পীড়নের স্বীকৃতি খুব কমই আছে। তার সরকার নির্মমভাবে দমন করতে চেয়েছিল, ব্যর্থ হয়েছে, তাকে দেশ ছাড়তে হয়েছে। কোনো অনুশোচনা নেই?

সজীব ওয়াজেদ : তা সত্য নয়। আপনি যদি আমার অনলাইনের বক্তব্য শুনেন।

শ্রীনিবাসন জৈন : ঠিক আছে।

সজীব ওয়াজেদ : আমি বারবার বলেছি, আওয়ামী লীগ প্রতিবাদগুলো ভুলভাবে সামলেছে। আমাদের সরকার ভুলভাবে সামলেছে।

শ্রীনিবাসন জৈন : কিন্তু ‘ভুলভাবে সামলানো’ কি খুব হালকা শব্দ নয়, যখন নিরাপত্তা বাহিনী আপনার মায়ের নির্দেশে শত শত নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীকে হত্যা করেছে?

সজীব ওয়াজেদ : এর কোনোটাই আমার মা নির্দেশ দেননি। যদি তিনি বিক্ষোভকারীদের হত্যা করতে রাজি হতেন, তিনি আজও ক্ষমতায় থাকতেন। ইরানে এখন কী হচ্ছে দেখুন, তারা কি কিছু করতে পারছে? না। আমার মায়ের বক্তব্য ছিল, ‘তারা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের দিকে আসছে। আমাদের বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী ও গার্ড প্রস্তুত। কিন্তু তা হলে শত শত মানুষ মারা যাবে। আমি তাদের রক্ত নিজের হাতে নিতে চাই না।’ এটাই তিনি বলেছিলেন।

অডিও রেকর্ডিং ও প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ

সজীব ওয়াজেদ : সে সময় শত শত পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন। আমাদেরও শত শত কর্মী নিহত হয়েছেন। এই শাসন আসলে বিক্ষোভকারীদের করা হত্যাকাণ্ডে দায়মুক্তি দিয়েছে। শ্রীনিবাসন জৈন : একটু এই শাসনের কথা বাদ দিই। আপনি যখন বলেন আপনার মা নির্দেশ দেননি, আলজাজিরা, বিবিসির রিপোর্ট, যে অডিও রেকর্ডিংগুলো এসেছে।

সজীব ওয়াজেদ : না!

শ্রীনিবাসন জৈন : আমি যদি একটু শেষ করতে পারি। সেই অডিওতে আপনার মাকে বলতে শোনা যায় যে তিনি বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি একটি খোলা নির্দেশ দিয়েছি। এখন তারা প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করবে। যেখানেই পাবে, গুলি করবে।’

সজীব ওয়াজেদ : না, আসলে এটা আলজাজিরা এবং বিবিসি, দুটিই ওই ক্লিপটি প্রেক্ষাপটের বাইরে নিয়ে গেছে। আমি সম্পূর্ণ ক্লিপটি আমার ফেসবুক পেজে দিয়েছিলাম। সেখানে তিনি বলেন, বিক্ষোভকারীদের গ্রেফতার করতে এবং সশস্ত্র জঙ্গিদের বিরুদ্ধে জানমাল ও সম্পত্তি রক্ষায় প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সেখানে জঙ্গিরা জড়িত ছিল। অনলাইনে অস্ত্রধারী বেসামরিক মানুষের ভিডিও আছে।

বেসামরিক ভুক্তভোগী

শ্রীনিবাসন জৈন : একটু থামুন, আমি ওই ক্লিপ প্রসঙ্গেই বলছি, অন্য সাক্ষাৎকারেও আপনাকে বলতে শুনেছি যে আপনি পুরো ক্লিপটি সোশ্যাল মিডিয়ায় দিয়েছেন। আমরা খুঁজেছি, আপনার সোশ্যাল মিডিয়া ঘেঁটে দেখেছি, কিন্তু এমন কোনো ক্লিপ পাইনি।

সজীব ওয়াজেদ : এটা অদ্ভুত।

শ্রীনিবাসন জৈন : তা হলে কি আপনি সেটি আমাদের সাথে শেয়ার করতে প্রস্তুত?

সজীব ওয়াজেদ : অবশ্যই। আমি আবার আপলোড করবো। কয়েকটি ক্লিপ নামিয়ে দেয়া হয়েছিল, আর কেন নামানো হয়েছিল তা আমি বলবো।

শ্রীনিবাসন জৈন : ঠিক আছে। কিন্তু আপনি যখন বলেন, তিনি সম্পত্তি রক্ষার বিষয়ে নির্দেশ দিচ্ছিলেন, তা তার বক্তব্যের সাথে পুরোপুরি মেলে না। কারণ তিনি যখন বলেন, ‘আমি খোলা নির্দেশ দিয়েছি, এখন তারা প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করবে, যেখানেই পাবে গুলি করবে’- এটা তো খুবই বিস্তৃত নির্দেশ মনে হয়।

সজীব ওয়াজেদ : কিন্তু সেটা ছিল সহিংস বিক্ষোভকারী, সশস্ত্র বিক্ষোভকারী- সন্ত্রাসীদের জন্য। নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের জন্য নয়। এখন যে কোনো দেশে- যদি সশস্ত্র বিক্ষোভকারীরা মানুষ ও পুলিশের ওপর গুলি চালায়, সরকার তখন কী করবে?

শ্রীনিবাসন জৈন : তা হলে মি. ওয়াজেদ, আপনি সশস্ত্র বিক্ষোভকারী ও সন্ত্রাসীদের কথা বলছেন। কিন্তু যাদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে, তাদের দিকে তাকান। আবু সাঈদ, ২৫ বছরের কলেজছাত্র, নিরস্ত্র পুলিশ খুব কাছ থেকে তাকে গুলি করে। হত্যাকাণ্ড ক্যামেরায় ধরা পড়ে, ভাইরাল হয়। সে কি কোনো উগ্রবাদী?

জোবায়েদ হোসেন ইমন, মাত্র ১২ বছর বয়স। হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালিয়ে নিরাপত্তা বাহিনী তাকে মাথায় গুলি করে।

মীর রহমান মুগ্ধ, ২৫ বছর বয়সী ছাত্র, নিরস্ত্র, বক্ষোভকারীদের পানি বিতরণ করার সময় পুলিশ তাকে গুলি করে হত্যা করে। এরা কি উগ্রবাদী?

সজীব ওয়াজেদ : পরিস্থিতি তখন অত্যন্ত সহিংস ছিল। কিছু পুলিশ কর্মকর্তা অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করেছে। আমাদের সরকার সে সময় অনেক পুলিশ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেছিল। আমরা তদন্তের জন্য একটি বিচার বিভাগীয় কমিটি গঠন করেছিলাম। সেই তদন্তগুলো কেন এগিয়ে নেয়া হয়নি?

ক্ষমা ও সাক্ষাৎ

শ্রীনিবাসন জৈন : আপনার মা কি, বা আপনি কি, এই সব বিক্ষোভকারীর পরিবার- জোবায়েদ হোসেন ইমন, মীর রহমান মুগ্ধ, আবু সাঈদের পরিবারসহ, সবার কাছে ক্ষমা চাইতে প্রস্তুত? যা ঘটেছে তার জন্য কি ক্ষমা চাইবেন?

সজীব ওয়াজেদ : ঘটনার পর পরই আমার মা আবু সাঈদের পরিবারের সাথে দেখা করেছিলেন। তিনি ইতোমধ্যেই তাদের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন।

শ্রীনিবাসন জৈন : ঠিক আছে।

সজীব ওয়াজেদ : আমাদের সরকার পতনের আগেই তিনি এসব পরিবারের কয়েকটির সাথে দেখা করেছিলেন। তিনি পূর্ণ তদন্ত ও পূর্ণ জবাবদিহির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

মৃত্যু সংখ্যা ও গণকবর

শ্রীনিবাসন জৈন : কিন্তু একাধিক তদন্ত ও পর্যবেক্ষক সংস্থা বলেছে, নিহত প্রায় ১৪০০ জনের বেশির ভাগই ছিল নির্দোষ, নিরস্ত্র বিক্ষোভকারী। এটা তো বিশাল।

সজীব ওয়াজেদ : হ্যাঁ, আমি জানি। কিন্তু সরকারের নিজের হিসাব অনুযায়ী সংখ্যাটা প্রায় ৮০০।

শ্রীনিবাসন জৈন : সেটাও কিন্তু বড় সংখ্যা।

সজীব ওয়াজেদ : আমি বুঝি। কিন্তু ১৪০০ সংখ্যাটা এসেছে- ১৫ আগস্ট পর্যন্ত হিসাব করে। আমাদের সরকার তো ৫ আগস্টেই পতন হয়। ৫ থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে যারা মারা গেছে, তাদের কে হত্যা করেছে?

শ্রীনিবাসন জৈন : কিন্তু মি. ওয়াজেদ, এখনো লাশ পাওয়া যাচ্ছে। এখনো গণকবর আবিষ্কৃত হচ্ছে, যেগুলো এই গণ-অভ্যুত্থানের সাথে যুক্ত।

সজীব ওয়াজেদ : আমি জানি। কিন্তু সেটা না, সেটা পুরোপুরি এই সরকারের সাজানো। না, কোনো গণকবর নেই। এটা

শ্রীনিবাসন জৈন : আপনি কি গণকবরের বিষয়টি অস্বীকার করছেন?

সজীব ওয়াজেদ : আমি গণকবরের কথা শুনিনি।

শ্রীনিবাসন জৈন : ঠিক আছে। কিন্তু এই মাসেই একটি গণকবর পাওয়া গেছে, যেখানে ১১৪টি লাশ ছিল।

সজীব ওয়াজেদ : আর আমাদের সরকার পতনের পর যে ৫০০ মানুষ মারা গেছে, তাদের কে হত্যা করেছে? কেন, কে তাদের হত্যা করেছে?

জাতিসঙ্ঘ প্রতিবেদন ও জবাবদিহি

শ্রীনিবাসন জৈন : সম্মানের সাথে বলছি, এটা তো ‘হোয়াটঅ্যাবাউটারিজম’।

সজীব ওয়াজেদ : না, এটা হোয়াটঅ্যাবাউটারিজম নয়! আপনি ১৪০০ সংখ্যার কথা বলছেন। বিচার সমান হতে হবে। একতরফা বিচার বিচার নয়।

শ্রীনিবাসন জৈন : ঠিক আছে। কিন্তু মি. ওয়াজেদ, সেই বিচার কি রাজনৈতিক নেতৃত্ব পর্যন্ত পৌঁছানো উচিত নয়? কারণ- আমি শেষ করতে দিচ্ছেন, জাতিসঙ্ঘের তদন্তে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীর দ্বারা বিক্ষোভকারীদের ওপর সংঘটিত গুরুতর নির্যাতন রাজনৈতিক নেতৃত্বের ‘পূর্ণ জ্ঞান, সমন্বয় ও নির্দেশনার’ মধ্যেই হয়েছে, যার মধ্যে আপনার মা স্পষ্টতই অন্তর্ভুক্ত।

সজীব ওয়াজেদ : এটা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত দাবি।

জাতিসঙ্ঘ প্রতিবেদন ও অডিও অস্বীকার

শ্রীনিবাসন জৈন : তা হলে আপনি জাতিসঙ্ঘের প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করছেন, বিবিসি ও আলজাজিরার অডিও প্রত্যাখ্যান করছেন, মানে আপনি খুব বেছে বেছে গ্রহণ করছেন।

সজীব ওয়াজেদ : না। অডিওতে আমার মা আছেন, আমি জানি। কিন্তু জাতিসঙ্ঘের প্রতিবেদন পক্ষপাতদুষ্ট। যেমন বলেছি, প্রতিবেদনে ১৪০০ মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে, যার মধ্যে আমাদের সরকার পতনের পরের মৃত্যুও আছে এবং সেগুলোর দায় আমাদের সরকারের ওপর চাপানো হয়েছে। এটা কীভাবে ন্যায্য হয়?

শ্রীনিবাসন জৈন : আসলে বেছে নেয়ার কাজটা বিবিসি ও আলজাজিরাই করেছে।

সজীব ওয়াজেদ : আর আমরা সম্পূর্ণ ক্লিপ অনলাইনে দিয়েছি। অন্য যাদের মৃত্যু হয়েছে, তাদের ছবিও দিয়েছি। নিহত পুলিশ সদস্যদের ছবিও দিয়েছি।

শ্রীনিবাসন জৈন : যেমন বলেছি, আমরা সে সব ক্লিপ খুঁজে পাইনি। আমরা আপনার কাছ থেকে সেগুলো পাবো।

সজীব ওয়াজেদ : অডিওতে আমার মা [কথা কেটে যায়]

শ্রীনিবাসন জৈন : এটা আপনার ব্যাপার। কিন্তু আমি মূল কথায় ফিরি। আপনি কি বলতে চান এই সব হত্যা ও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের জন্য আপনার মা একেবারেই দায়ী নন?

সজীব ওয়াজেদ : না, আমি তা বলছি না। একেবারেই না। আমি বলছি, আমরা কাউকে দায়মুক্তি দিইনি। আমরা সবার জন্য বিচার চেয়েছি, যে কোনো মৃত্যুর জন্য যারা দায়ী।

শ্রীনিবাসন জৈন : তার মধ্যেও কি তিনি অন্তর্ভুক্ত? তার জন্য কী বিচার?

সজীব ওয়াজেদ : কারণ আমার মা কোনো হত্যার নির্দেশ দেননি। তিনি কোনো মৃত্যু চাননি।

শ্রীনিবাসন জৈন : আমি যেমন বলেছি, অডিও আছে, জাতিসঙ্ঘের প্রতিবেদন আছে। আপনি দুটোই প্রত্যাখ্যান করছেন।

সজীব ওয়াজেদ : না, অডিওতে আমার মা- [ওভারল্যাপ]

দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ

শ্রীনিবাসন জৈন : ঠিক আছে, এবার অন্য প্রসঙ্গে আসি। শুধু দমন-পীড়নের অভিযোগই নয়, আপনাসহ দলের শীর্ষ নেতা ও পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। আপনার বিরুদ্ধেও কোটি কোটি ডলারের অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে, যা দিয়ে নাকি আপনি আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে বাড়ি কিনেছেন, এমনটাই বলছে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ।

সজীব ওয়াজেদ : ঠিক।

শ্রীনিবাসন জৈন : এটা কি সত্য?

সজীব ওয়াজেদ : কোথায় সেই বাড়িগুলো? আপনি তো আমার বাড়িতেই বসে আছেন। এটাই আমার একমাত্র বাড়ি। আমি এ বছরই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পেয়েছি। যদি আমার লুকানো সম্পদ থাকত, যদি এত অবৈধ সম্পত্তি থাকত, তা হলে আমি কীভাবে মার্কিন নাগরিকত্ব পেতাম? এফবিআই আমাকে তদন্ত করেছে। সেগুলো কোথায়? অভিযোগ তোলা খুব সহজ।

টিউলিপ সিদ্দিকের পদত্যাগ

শ্রীনিবাসন জৈন : মি. ওয়াজেদ, যদি অভিযোগগুলো এতই ভিত্তিহীন হয়, তা হলে আপনার চাচাতো বোন টিউলিপ সিদ্দিক, যিনি যুক্তরাজ্যের এমপি, স্টারমার সরকারের মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করলেন কেন? তার বিরুদ্ধেও তো একই অভিযোগ উঠেছে।

সজীব ওয়াজেদ : হ্যাঁ, সেটা ছিল রাজনৈতিক বিব্রতকর পরিস্থিতির কারণে। তার বিরুদ্ধে একটি অপপ্রচার চালানো হয়েছিল। আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের সরকার, এই শাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন, এক টুকরো কাগজ, একটুও প্রমাণ দেয়নি। আমাদের কিছুই দেয়নি।

শ্রীনিবাসন জৈন : কিন্তু যদি অভিযোগ এতটাই তুচ্ছ হতো, তা হলে যুক্তরাজ্যের মন্ত্রিসভার একজন মন্ত্রীকে তো পদত্যাগ করতে হতো না। এটা তো ইঙ্গিত দেয়, কিছু না কিছু গুরুতর বিষয় ছিল।

সজীব ওয়াজেদ : যুক্তরাজ্যের পর্যবেক্ষক সংস্থা তাকে ক্লিয়ার করেছে। তারা তদন্ত করে তাকে নির্দোষ ঘোষণা করেছে।

শ্রীনিবাসন জৈন : কিন্তু তাকে তো পদত্যাগ করতে হয়েছে?

সজীব ওয়াজেদ : সরকারকে বিব্রত না করতে তিনি পদত্যাগ করেছেন। কিন্তু যুক্তরাজ্যের সংস্থাই টিউলিপকে সব অনিয়ম থেকে মুক্ত ঘোষণা করেছে। তারা কীভাবে তাকে ক্লিয়ার করল?

সাইফুজ্জামান চৌধুরীর সম্পত্তি।

শ্রীনিবাসন জৈন : তা হলে আওয়ামী লীগের সেই মন্ত্রীর কী হবে, সাবেক সেই মন্ত্রী, যার যুক্তরাজ্যে ৩৬০টি বাড়ি থাকার তথ্য পাওয়া গেছে? সেসব সম্পত্তি এখন জব্দ করা হয়েছে। এটা তো ভুয়া নয়।

সজীব ওয়াজেদ : এর সাথে আমার কী সম্পর্ক?

শ্রীনিবাসন জৈন : তিনি তো আপনার মায়ের মন্ত্রিসভার একজন মন্ত্রী ছিলেন।

সজীব ওয়াজেদ : আমি দায়ী হতে পারি না- আমার পরিবারও সবার জন্য দায়ী হতে পারে না।

শ্রীনিবাসন জৈন : আপনার মা কি জানতেন, আপনার সরকার কি জানত, কারণ এটাই তো বড় অভিযোগ, শুধু পরিবার নয়, সবাই জড়িত ছিল, তারা কি জানত যে এই ব্যক্তি যুক্তরাজ্যে ৩৬০টি বাড়ি কিনছেন? বাংলাদেশ তো একটি দরিদ্র দেশ।

সজীব ওয়াজেদ : আমার যতটুকু জানা আছে, সেই ভদ্রলোকের পরিবার বহু প্রজন্ম ধরেই ধনী। যুক্তরাষ্ট্রে তাদের সম্পত্তি আছে, যুক্তরাজ্যেও আছে, বহু বছর ধরে তারা বিনিয়োগ করে আসছে। এটুকুই আমি জানি।

শ্রীনিবাসন জৈন : তা হলে আপনি বলছেন, এই ৩৬০টি বাড়ি সবই তার ব্যক্তিগত সম্পদ থেকে কেনা? কারণ যুক্তরাজ্যের কর্তৃপক্ষ কিন্তু তা মনে করে না। তারা সেগুলো জব্দ করেছে।

সজীব ওয়াজেদ : সেটা আমি জানি না। এটা তার আর- আমি তো তার হিসাব রাখতে পারি না। আমি শুধু জানি, তার পরিবার বহু দশক ধরে ব্যবসার সাথে জড়িত।

শ্রীনিবাসন জৈন : আপনার মা কি তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিয়েছিলেন?

সজীব ওয়াজেদ : এই অভিযোগগুলো আমরা এখন পর্যন্ত জানতামই না।

শ্রীনিবাসন জৈন : কিন্তু অভিযোগগুলো তো আপনারা ক্ষমতায় থাকতেই সামনে আসে। জুলাই অভ্যুত্থানের আগেই, ২০২৩ সালের শেষ দিকে ও ২০২৪ সালের শুরুতে, প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

সজীব ওয়াজেদ : দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমি এসব সম্পর্কে কিছুই জানি না, তাই এ বিষয়ে উত্তর দিতে পারছি না।

শ্রীনিবাসন জৈন : কিন্তু এটা কি আপনাকে উদ্বিগ্ন করে না? কারণ এ ধরনের প্রমাণ তো ইঙ্গিত দেয় যে আপনার মায়ের সরকারের ভেতরে খুব উচ্চ পর্যায়ে দুর্নীতি ছিল।

সজীব ওয়াজেদ : আবারো বলছি, দুর্নীতিবাজ মানুষ কি ছিল? সম্ভবত ছিল। কিন্তু যে কোনো দেশেই শত ভাগ দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব। আমরা চেষ্টা করেছি। অনেককে বিচারের আওতায় এনেছি। কিন্তু আমার মা মূলত উন্নয়নের দিকেই মনোযোগী ছিলেন।

ভারত-বাংলাদেশ উত্তেজনা

শ্রীনিবাসন জৈন : ঠিক আছে, আরেকটি বড় বিষয় নিয়ে আপনাকে প্রশ্ন করি, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনা। দুটি দেশ ঐতিহাসিকভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ হলেও এখন সম্পর্ক খারাপ হচ্ছে। এর প্রধান কারণ আপনার মায়ের ভারতে অবস্থান, যেখানে তিনি দেড় বছর ধরে রয়েছেন। বাংলাদেশ তাকে প্রত্যর্পণের (এক্সট্রাডিশন) অনুরোধ করেছে, ভারত এখনো তা প্রত্যাখ্যান করেছে। এটা তো টেকসই অবস্থান নয়। কোনো ‘প্ল্যান বি’ আছে কি?

সজীব ওয়াজেদ : প্ল্যান বিকিসের?

শ্রীনিবাসন জৈন : আপনার মায়ের ভারতে থাকা নিয়ে। তিনি কত দিন সেখানে থাকতে পারবেন? কারণ শুরুতে তো এটা চূড়ান্ত পরিকল্পনা ছিল না- তিনি সেখানেই দীর্ঘদিন থাকবেন।

সজীব ওয়াজেদ : না।

শ্রীনিবাসন জৈন : ভারত তো ট্রানজিট পয়েন্ট হওয়ার কথা ছিল, তাই না?

সজীব ওয়াজেদ : অবশ্যই না। এটা ভুল ধারণা। ভারতই আসলে তার জন্য বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ দেশ।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও প্রত্যর্পণ

শ্রীনিবাসন জৈন : তা হলে শুরু থেকেই পরিকল্পনা ছিল তিনি ভারতেই থাকবেন?

সজীব ওয়াজেদ : দেখুন, এটা কোনো পরিকল্পিত পরিস্থিতি ছিল না। হঠাৎ করেই সব ঘটে যায়। ভারত ছিল তার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। আমার মা আসলে দেশে ফিরতে চান। তিনি অবসর নিতে চান। বিদেশে থাকতে চান না।

শ্রীনিবাসন জৈন : কিন্তু আপাতত তো সেটা সম্ভব নয়।

সজীব ওয়াজেদ : এই মুহূর্তে না। তবে একসময় সম্ভব হবে।

শ্রীনিবাসন জৈন : কিন্তু রিপোর্টিংয়ে বলা হয়েছিল, তিনি এমন একটি দেশ খুঁজছিলেন যা ভূরাজনৈতিকভাবে ভারতের চেয়ে কম সংবেদনশীল। কারণ ভারতে তার উপস্থিতি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। আর কি এই কারণেই তিনি সেখানে থেকে গেছেন যে, এত অভিযোগ ও মামলার কারণে অন্য কোনো দেশ তাকে নিতে রাজি হয়নি?

সজীব ওয়াজেদ : না, না, একেবারেই না। আমরা কখনোই আমার মায়ের জন্য অন্য কোথাও যাওয়ার চেষ্টা করিনি। সেটাই কোনো ইস্যু নয়। ভারতই তার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ দেশ। আর উত্তেজনার কারণ আমার মা নন। উত্তেজনার কারণ সন্ত্রাসবাদের উত্থান। ইউনূস সরকার কারাগার থেকে দণ্ডপ্রাপ্ত সব সন্ত্রাসীকে মুক্তি দিয়েছে। ভারতের পূর্ব সীমান্তে সন্ত্রাসবাদ নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। পাকিস্তানকে ভারতের ভেতরে অবাধ সুযোগ দেয়া হয়েছে।

উসকানিমূলক বক্তব্য ও প্রত্যর্পণ দাবি

শ্রীনিবাসন জৈন : আসলে, মি. ওয়াজেদ, উত্তেজনার কারণ হলো, বাংলাদেশ অভিযোগ করছে যে আপনার মা ভারতীয় ভূখণ্ডে বসে উসকানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছেন। এটাও বড় কারণ। আর দ্বিতীয় কারণ হলো- ভারত তাকে প্রত্যর্পণ করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। এগুলোই প্রধান ট্রিগার।

সজীব ওয়াজেদ : ঠিক। মানে আপনি বলছেন, ইউনূস সরকার অভিযোগ করছে যে আমার মা তার বাকস্বাধীনতা ব্যবহার করছেন। তারা এতটাই ভয় পাচ্ছে যে তিনি কথা বলছেন?

শ্রীনিবাসন জৈন : আমি কূটনৈতিক টানাপড়েনের কথা বলছি। কারণ শেষ পর্যন্ত এটা বাস্তব রাজনীতি। ভারত কি অনির্দিষ্টকাল এই প্রত্যর্পণ অনুরোধ আটকে রাখতে পারবে? সরকার তো বদলায়। ভারত সরকার ইতোমধ্যে বাংলাদেশের সম্ভাব্য নতুন শাসকদের সাথে যোগাযোগ করছে। এক সময় তারা বলতে পারে, ‘আমরা আর এটা ধরে রাখতে পারছি না।’

সজীব ওয়াজেদ : প্রত্যর্পণ একটি বিচারিক প্রক্রিয়া। তার জন্য দোষ প্রমাণিত হতে হবে, প্রমাণ ভারতীয় আদালতে দিতে হবে। বাংলাদেশে বর্তমান শাসনের কাছে আমার মায়ের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ নেই। যে রায় দেয়া হয়েছে, তা ছিল প্রহসন। তড়িঘড়ি করে দেয়া হয়েছে।

শ্রীনিবাসন জৈন : আপনি আপনার মায়ের সেই রায়ের কথা বলছেন, যেখানে তাকে বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে।

সজীব ওয়াজেদ : হ্যাঁ, সেটাই ছিল ভুয়া বিচার। আমার মাকে নিজের আইনজীবী নিয়োগের সুযোগই দেয়া হয়নি। বিচার চালানোর জন্য আইন বদলানো হয়েছে। সংসদ ছাড়া আইন পরিবর্তন করা যায় না।

ভারতের ওপর আস্থা

সজীব ওয়াজেদ : প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে মূল বিচারিক প্রক্রিয়াকে অবশ্যই ন্যায়বিচারের মানদণ্ড মানতে হবে। তা না হলে প্রত্যর্পণ সম্ভব নয়।

শ্রীনিবাসন জৈন : কিন্তু শেষ পর্যন্ত এগুলো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও। ভারতে তাকে থাকতে দেয়া ছিল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। রাজনীতি পরিবর্তনশীল। বাস্তবতা বদলাতে পারে। তাই আমি জিজ্ঞেস করছি, কোনো প্ল্যান বি আছে কি?

সজীব ওয়াজেদ : না। ভারতের ওপর আমাদের পূর্ণ আস্থা আছে। ভারত আইনের দেশ। বাংলাদেশ এখন যেমন- একটি ‘ক্যাঙ্গারু রিপাবলিক’, ‘বানানা রিপাবলিক’ ভারত তেমন নয়। তারা আমার মাকে প্রত্যর্পণ করবে না।

শ্রীনিবাসন জৈন : আপনি কি বলছেন, ভারত আপনাকে এমন আশ্বাস দিয়েছে?

সজীব ওয়াজেদ : না, কোনো আনুষ্ঠানিক আশ্বাস নয়। কিন্তু আমি বিচারিক প্রক্রিয়া জানি। আমি জীবনের ১৩ বছর ভারতে কাটিয়েছি। ভারত আইন দ্বারা পরিচালিত দেশ।

আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ

শ্রীনিবাসন জৈন : শেষ প্রশ্ন- বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের কি ভবিষ্যৎ আছে?

সজীব ওয়াজেদ : অবশ্যই আছে। আওয়ামী লীগ কোথাও যাচ্ছে না। এটি দেশের সবচেয়ে পুরনো ও বৃহত্তম দল। আমাদের ভোটশেয়ার ৪০-৫০ শতাংশ। আপনি কি মনে করেন, এই ৪০-৫০ শতাংশ মানুষ হঠাৎ সমর্থন বন্ধ করে দেবে? ১৭ কোটি মানুষের দেশে ৬-৭ কোটি ভোটার আওয়ামী লীগের সমর্থক। তারা হঠাৎ দল ছেড়ে দেবে?

শ্রীনিবাসন জৈন : আমি জিজ্ঞেস করছি কারণ আপনি বলেছেন আপনার মা রাজনীতি থেকে অবসর নিতে চান। যদি তিনি দেশে ফিরতেও পারেন, তিনি আর সক্রিয় রাজনীতিতে থাকবেন না?

সজীব ওয়াজেদ : না। তিনি বয়স্ক। এটিই তার শেষ মেয়াদ হওয়ার কথা ছিল। তিনি অবসর নিতে চেয়েছিলেন।

শ্রীনিবাসন জৈন : তা হলে এটা কি হাসিনা যুগের সমাপ্তি?

সজীব ওয়াজেদ : সম্ভবত, হ্যাঁ।

শ্রীনিবাসন জৈন : অর্থাৎ আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ফিরলেও তার নেতৃত্ব ছাড়াই?

সজীব ওয়াজেদ : হ্যাঁ। আওয়ামী লীগ একটি রাজনৈতিক দল। ৭০ বছরের পুরনো। তার সাথে বা তাকে ছাড়াই দল থাকবে। কেউ চিরকাল বাঁচে না।

উপসংহার

শ্রীনিবাসন জৈন : তরুণ বাংলাদেশীরা, যাদের অনেকেই সেই অভ্যুত্থানের অংশ ছিল যা আপনার সরকার ও আপনার মাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়েছে, তারা কেন আপনার দলকে বিশ্বাস করবে?

সজীব ওয়াজেদ : তা হলে আসুন, একটি সুষ্ঠু ভোটে বিষয়টি জনগণের ওপর ছেড়ে দেয়া যাক। ১৭ বছরে আওয়ামী লীগ যে উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা দিয়েছে, সন্ত্রাস দমনে যে ভূমিকা রেখেছে, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। এটা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না।

শ্রীনিবাসন জৈন : যদি তাই হতো, তা হলে মানুষ রাস্তায় নেমে তাকে ক্ষমতা থেকে সরাতো কেন? নিশ্চয়ই কিছু গভীর সমস্যা ছিল। তবে এখানেই থামি। আপনি বলছেন, আওয়ামী লীগই বাংলাদেশের বিশৃঙ্খলার প্রতিষেধক। বিপ্লবের পর কিছু বিশৃঙ্খলা আসবেই। কিন্তু সেটার কারণ আপনি ছিলেন, নাকি সমাধান, তা বিতর্কের বিষয়।

সজীব ওয়াজেদ : দেখুন, ১৭ বছরে কি আমাদের সরকার ভুল করেছে? সরকারে থাকা মানুষজন কি বাড়াবাড়ি করেছে? হ্যাঁ। আমিও অনেক বিষয়ে সন্তুষ্ট ছিলাম না। আমার মনে হয়েছে, কিছু লোককে জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত ছিল, যা হয়নি।

শ্রীনিবাসন জৈন : এটা কি দায় এড়ানো নয়?

সজীব ওয়াজেদ : না। কারণ গত দেড় বছরে কী হয়েছে দেখুন। পরিস্থিতি আরো খারাপ। অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে। আইনশৃঙ্খলা নেই। সন্ত্রাসীরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। আর এখন সম্পূর্ণ কারচুপিপূর্ণ, প্রহসনমূলক নির্বাচন হয়েছে।

শ্রীনিবাসন জৈন : ঠিক আছে। কারণ নাকি সমাধান- এটা বিতর্কের বিষয়ই থাকবে। অনেকেই আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ তুলবে। তবে আমাদের সাথে কথা বলার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

সজীব ওয়াজেদ : আমার আনন্দ।

শ্রীনিবাসন জৈন : এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়ার জন্য।

সজীব ওয়াজেদ : ধন্যবাদ।