Home জাতীয় ২০২১-এর ইচ্ছাগুলো…

২০২১-এর ইচ্ছাগুলো…

সাজ্জাদ আলী : দেশে পৌঁছনোর পরদিন সকালেই আম্মা আমাকে কাঁচা বাজারে পাঠান। ভাবখানা এই যে এতদিন আমি ছিলাম না বলে তাঁর বাজার-ঘাট সব বন্ধ ছিল। আম্মার এ অভ্যাসটি পুরোনো। সেই বালক বেলাতেই সকাল সকাল তিনি খালই আর টাকা হাতে দিয়ে বাজারে পাঠাতেন। সেই ছিল আমার দিনের প্রথম কাজ। অনেকটা দম দেওয়া খেলনার মতোই ফর্দ মিলিয়ে বাজার করতাম। তবে এখন এই বাজারে পাঠানো নিয়ে বোনদের সাথে আম্মার চিল্লাপাল্লা লেগে যায়। ওরা বলে, মাত্র ছয় দিনের জন্যি বেড়াতে আইছে, দাদুরে আপনার বাজারে পাঠানোর দরকারটা কী? খালি তারে হার্টটাইম দেবার তালে থাকেন। সারা বছর কাজের লোকদের করা বাজারই তো খান, না কী?

আম্মা রেগেমেগে আগুন! বলেন, অ্যাই ঝগড়াইট্যার ঝাঁক, ভাই’র দালালগুলান, ও দ্যাশে না থাকলে নাই। কিন্তু যখন ও বাসায় আছে তখন বাড়ির বড় ছাওয়াল বাজারে যাবি, সেইডাইতো কথা। তগো লাটসাহেব বাপও আমারে বাজার কইরা দিতো। দূর হ’ সামনে থেকে!
বাজার নিয়ে ফেরার পরে কাজের মেয়েটি খালই থেকে পচা আলু বের করে বলে, ও আল্লা ভাইজান আলুডা তো পচা, দেইখা কেনেন নাই?
আম্মা ধমকে বলেন, বেশি কথা কইস নাতো! পচাটুক কাইটা ফালাইয়া দে। ভালটুক ফালি ফালি কইরা তরকারির মধ্যি দিবি। এদিকে ঢেড়সগুলা সব সুটা, আমি ঠিক চিনে কিনতে পারিনি। আম্মা বলবেন, তাতে কী হইছে ঢেড়সতো আইজই ভাজবো।
আবার লাউটা হাতে নিয়ে ছোটকাকী বলেন, বাজান কদুর মধ্যি আঙ্গুলের চাড়ি ঢুকাইয়া টেষ্ট করবা না, ওডা বুড়া না জালি দ্যাখবানা?
আমি বলি, কাকী চেনা দোকানদার, সে তো কইলো ভাইজান অনেক বছর পর বাজারে আইছেন, এই জালি কদুডা লইয়া যান!
বোনদেও মুখে চাপা হাসি! বলে, আম্মা আপনার বড় ছেলে খালই ভইরা টাটকা বাজার কইরা আইনছে!

২০২১ সালে প্রথম সুযোগেই আম্মার বাজার করে দিতে যাবো। বোনদের সাথে কাটাবো ক’টি দিন। আলভীকে সাথে নিয়ে দুভাই একটি দিনের জন্য দাদীর বাড়িতে যাবো। সেখানে আমার মেজোকাকা, সেজোকাকা, বুড়ো মা, দাদা, দাদী, আর আমার আব্বা সারি বেঁধে শুয়ে আছেন। সারা বছর ওঁরা অপেক্ষায় থাকেন, ওঁদের বড় ছেলেটি কতদিনে বাড়িতে ফিরবে। তাদের জন্য দুহাত তুলে পরওয়ারদিগারের কাছে দোয়া চাইব।

সেদিন এক ফাঁকে নোয়াকাকার সাথে গাঁয়ের এ মাথা থেকে ও মাথা অব্দি পায়ে হাঁটবো। সে পথে দৌঁড়ঝাপ করেই আমি বড় হয়েছি। রাস্তার দুপাশের সব বাড়িগুলোই আমাকে চেনে। শান্তি কাকু, দফাদার ভাই, আবু জায়েদ কাকা, আকু ভাই, মহাদেব দাদু, উলু ভাই, এদের কোলে-ঘাড়ে চড়েই আমি বেড়ে উঠেছি। আজ আমি চিৎকার করে ডাকলেও এদের অনেকেই ওপার থেকে শুনতে পাবে না। তবু আমি গলা ফাটিয়ে ডাকবো ওদের। জমসেদের দোকানে বসে চা খাবো। বিকালে ভেতর বাড়ির উঠানে বসে মিলনের কাছে গাঁয়ের পলিটিক্সের খুঁটিনাটি শুনবো। সন্ধ্যায় ফিরে আসবার আগে দাদার আমলের দোনলা বন্দুক থেকে জোড়া বুলেট ছুড়ে নিশানাটা ঠিক আছে কিনা তা পরখ করবো।

কিন্তু এত যে অভিলাষ আমার, দেশে যাবোটা কীভাবে? ডাক্তারের তো কড়া বারণ, কানাডার বাইরে যাওয়া চলবে না। আমি বলি, আচ্ছা ডাক্তার লোকজন তো এখন বাংলাদেশে যাচ্ছে আসছে, তুমি খামাখা আমাকে আটকে দিচ্ছো কেন?
যার যাবার সে যাক, তুমি যাবে না। তোমার শরীরে যে সব সমস্যা আছে তাতে করে করোনা আক্রান্ত হলে রিক্স ফ্যাক্টর খুব হাই হবে, গম্ভীর মুখে কথাগুলো বলে গেল এই ইরানিয়ান সুন্দরী।
দেখ ডাক্তার, তোমাকে আগেও বলেছি যে তোমার হাসি মুখখানা দেখতেই এখানে আসি। নইলে তোমার মেডিক্যাল শাস্ত্র যাই বলুক আমার এমন কোনো রোগবালাই নেই যে তোমার অফিসে ধর্না দিতে হবে। আচ্ছা আজ তুমি রেগে আছ কেন বলোতো?
মুখ টিপে হাসলো আমার ডাক্তারনি! বললো, রোগ নেই, তাই না? প্রতি রাতে তাহলে অকারণেই তোমার চার পদের বড়ি খেতে হয়, কী বলো? শোনো, মাথা গরম কোরো না। যত শীঘ্র সম্ভব আমি তোমাকে ভ্যাকসিন দেবার ব্যবস্থা করছি। তার আগে মায়ের কাছে যাবার কথা মুখেও আনবে না।

হ্যাঁ, ২০২১ সালের পয়লা নম্বরের কাজ হলো করোনা ভ্যাকসিনটি নেওয়া। ডাক্তারনির কাছে জোর তদবির করে রেখেছি, পেয়ে যাবো শীঘ্র। ১৮ বছর ধরে মহিলা আমার পারিবারিক ডাক্তার, আর অন্তত এক যুগের সখ্যতা আছে আমাদের। তদবির বিফলে যাবে না।
২০২১ এর সব ইচ্ছাগুলো মনের মধ্যে কিলবিল করছে। কোনটা যে আগে বলি, সেই এক সংকট। গত ফেব্রæয়ারী থেকে তাপসীকে চিনি। এ ক’মাসে এটা পরিস্কার যে, ওকে আমার বড়ই প্রয়োজন, তারও আমাকে। ধরুন বিশেষ কোনো কারণে আমার এখনই জানা চাই, “পথের পাঁচালী” উপন্যাসখানি কার লেখা, বা গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থে কতগুলি গীতিকবিতা আছে? এমন যে কোনো প্রশ্ন তাকে লিখে পাঠালে সাথে সাথেই সঠিক জবাবটি মেলে। এই তাপসীটি যেন একখানা চলমান বিশ্বকোষ!

সম্প্রতি ঠিক করেছি যে কিংবদন্তি অভিনেত্রী সুচিত্রা সেনের উপরে একটা টেলিভিশন ফিচার তৈরি করবো। সে জন্য সুচিত্রার অভিনীত সব সিনেমাগুলো দেখে দেখে গুরুত্বপূর্ণ ফুটেজগুলো বাছাই করা দরকার। কিন্তু আমার ব্যস্ত জীবনে ৫০টি সিনেমা দেখার সময় কোথায়? হাত বাড়ালাম তাপসীর দিকে, এ যাত্রা উদ্ধার করো সখি। মাত্র ১০/১২ দিনের মধ্যেই সে আমার তরীখানা ঘাটে ভিড়িয়ে দিয়েছে। সিনেমাগুলো দেখে যাচাই বাছাই করে ১৭ টুকরো ফুটেজ গত পরশু আমাকে মেইল করেছে। কী ভাষায় যে আমি কৃতজ্ঞতা বলি, তা খুঁজে পাই না। শিল্প বুঝতে পারা এমন সাথি ভাগ্যগুণে মেলে। আগামী মাসে কলকাতার শিশির মঞ্চে তাপসীকে গাইতে হবে। গাইবে রবীন্দ্রনাথের ওই গানটি “ক্ষমিতে পারিলাম না যে ক্ষমো হে মোর দীনতা”। তবলা ছাড়া শুধু তানপুরা আর এস্রাজের সাথে গানটি গেয়ে আমাকে পাঠিয়েছে। সাথে ছোট্ট একটি অনুরোধ,
“স্বরবিতান সামনে নিয়ে গানটি শুনবে প্লিজ। কোথাও সুরের হানি করেছি কিনা, স্পর্শ স্বরগুলো গলায় ঠিকঠাক লেগেছে কিনা তা দেখে দাও”। প্রসঙ্গক্রমে আরো লিখেছে, কী জান ভুল সুধরে দেবার লোকে বড়ই অভাব। চারপাশের সব অবুঝরা বোঝার ভান করে শুধুই পিঠ চাপড়ায়, অসহ্য প্রসংশা চারিদিকে। তাপসীকে এখনও দেখিনি, ফোন কল বা ভিডিও কলে কথাও হয়নি কখনো। যত কথা তার সাথে সব টেক্সটে লিখে। হাজার হাজার শব্দ লেখা রয়েছে সে টেক্সটের খাতায়! গত ১১ মাসে আমি দুবার ফোন করেছি, ধরেনি আমার ফোন। লিখে পাঠিয়েছে,
“আমার জীবনের “বেঠিক” সময়ের “সঠিক” মানুষটি তুমি। তোমাকে প্রথম দেখতে চাই আমার শান্তিনিকেতনের ভূবনে। আর কথা শুরু হবে সেখানেই, কোনো এক চাঁদনি রাতে খোয়াই’র খাদে লাল মাটিতে বসে। অনেক কথা জমিয়ে রেখেছি, শুনতে হবে সব। “উঠি উঠি” করবে না কিন্তু সে রাতে।” এ আহবানে মৌন থেকেই তাকে বুঝিয়ে দিয়েছি, নিশ্চয়ই সে রাতটি তোমাতে সমর্পিত হবে গো সজনী। গত একটি বছর ধরে যতনে যে ফুল ফুটিয়েছো তুমি, নতুন বছরে প্রজাপতি পাখা মেলে তার পাঁপড়ি ছোঁবে।
“মুছে যাক গ্লানি ঘুচে যাক জরা,
অগ্নি স্নানে শুচি হোক ধরা..”
২০২১ সাল সব বন্ধু স্বজন পরিজনদের জন্য হয়ে উঠুক আনন্দ সাফল্য আর সৌভাগ্যের বছর। হ্যাপি নিউ ইয়ার ২০২১! (লেখক বাংলা টেলিভিশন কানাডা’র নির্বাহী)

Exit mobile version