সিনহা আবুল মনসুর : পর্ব: সাত
অয়নের ডায়েরি
সোমবার
৪ঠা জুন ১৯৮৪
সুখ-দুঃখ পালা করে আসে। আমাদের জীবনেও এল। প্রতিদিনের মতো সেদিনও স্কুলে গেছি। টিফিন পিরিয়ডের পর ক্লাসে এলেন হেড স্যার। হেড স্যার ঘোষণা দিলেন, ‘ছেলেরা, মনোযোগ দিতে শোনো, দুই মাস পর প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা। এবারে আমাদের স্কুল থেকে দশজন ছাত্রকে আমরা বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নেবার জন্য মনোনীত করেছি। ক্লাসের পড়াশোনার বাইরেও এই দশজনকে আলাদা কোচিং দেওয়া হবে। আশা করি এরা আমাদের স্কুলের মুখ উজ্জ্বল করবে।’

হেড স্যারের ওই লিস্টে অপু আর আমার নাম ছিল প্রথমেই।
আমরা পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। ছুটির দিনেও স্কুলে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা করে কাটাই। খেলার মাঠে কম যাই। পড়াশোনার চাপে ও বৃত্তি পরীক্ষার উত্তেজনায় একসময় বাসন্তী আমাদের স্মৃতির বাইরে চলে গেল!
এক ছুটির দিনের সকালে হেড স্যার এলেন আমাদের ক্লাস নিতে। ক্লাসে এসেই তিনি আমাদের প্রত্যেকের হাতে একটি করে সাদা পাতা দিয়ে বললেন:
‘ছেলেরা, তোমরা জীবনে কে কী হতে চাও, তা এই সাদা পাতায় লেখো। আধঘণ্টা সময়’!
আমরা যে যার মতো করে লিখলাম। হেড স্যার আমাদের উত্তরপত্রগুলো নিয়ে চলে গেলেন। দ্বিজেন স্যার আমাদের অঙ্ক করাতে শুরু করলেন।
হেড স্যার ফিরে এলেন পরের সপ্তাহে। উত্তরপত্রসহ।
হেড স্যার আমার উত্তরপত্রের প্রথম কয়েকটি লাইন উচ্চস্বরে পড়লেন। ওখানে আমি লিখেছি:
‘নতুন টাকার গন্ধ আমার খুব ভালো লাগে। ভালো লাগে গোলাপের গন্ধও। সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে নতুন বইয়ের গন্ধ। নতুন টাকা, গোলাপ আর নতুন বইয়ের গন্ধে মাঝে মাঝে আমার ঘুম আসে না। জীবনে আমি এগুলো সবচেয়ে বেশি করে পেতে চাই। এগুলো পেতে হলে অনেক অনেক টাকার দরকার। তাই আমি ধনী হতে চাই।’
হেড স্যার আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘অয়ন, তুমি যা যা লিখেছ, তা কি তুমি বিশ্বাস করো?’
আমি বললাম, ‘জি স্যার, বিশ্বাস করি।’

স্যার বললেন, ‘কি জানো অয়ন, আমরা অনেক জিনিস বিশ্বাস করি না কিন্তু পরীক্ষার খাতায় লিখি। আবার অনেক জিনিস বিশ্বাস করি, কিন্তু পরীক্ষার খাতায় লিখি না, লিখতে সাহস করি না। লেখা উচিত কি না তা-ও আমরা জানি না। দোয়া করি অয়ন, বড় হয়ে তুমি অনেক ধনবান হও। বিশাল বিশাল গোলাপের বাগান বানাও। আর তৈরি করো বড় বড় সব লাইব্রেরি। ওই সব লাইব্রেরিতে জ্ঞানতপস্যা করুক তোমার মতো হাজারো অয়ন’!
এই কথাগুলো বলেই স্যার আমায় জড়িয়ে ধরলেন।
স্যারের চোখে জল!
জল এল আমাদের সবার চোখে!
পুরো ক্লাসে নেমে এল পিনপতন নীরবতা!
আজকাল আমার প্রায়ই মনে হয়, স্যার এখন কোথায় আছেন।
কেমন আছেন?
বেঁচে আছেন তো!
অপু মেডিকেলে আর আমি বুয়েটে ভর্তি হবার পর গেলাম ছোটবেলার স্কুলে, স্যারের সাথে দেখা করতে।
না, স্যারের দেখা পাইনি।
স্যার অবসর নিয়েছেন।
কোথায় থাকেন কেউ জানে না।
কিন্তু আমি জানি, অপুও জানে, স্যার আছেন আমাদের খুব কাছে, আমাদের মনে!
আমাদের অন্তরে!
অয়নের ডায়েরি
শুক্রবার
৮ই জুন ১৯৮৪।

জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে বৃত্তি পরীক্ষার ফল বেরোল। আমাদের স্কুল থেকে পাঁচজন বৃত্তি পেল। অপু আর আমি দুজনেই প্রথম গ্রেডে বৃত্তি পেলাম। আমাদের এই সফলতায় খুশি হলেন আমাদের স্কুলের শিক্ষকেরা, খুশি হলেন আমাদের মা-বাবা, ভাইবোনেরা। খুশি হলেন আমাদের পাড়া-প্রতিবেশী সবাই।
বৃত্তি পাওয়ার তিন দিনের মাথায় এক বিকেলে অপুর বড় ভাই আমাদের বললেন, ‘তোরা ভালো জামাকাপড় পরে নে। আজ তোদের একটা বিশেষ জায়গায় নিয়ে যাব।’
আমরা তত্ক্ষণাত ভালো জামাকাপড় পরে তৈরি হলাম।
অপুর এই ভাইয়ের নাম সাঈদ। আমরা ডাকতাম সাঈদ ভাই। কিছুদিন আগে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছেন। ভালো ছাত্র হিসেবে স্কুলে তার অনেক নামডাক। ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েই ওনারা সাত বন্ধু মিলে চিটাগাং, কক্সবাজার আর রাঙামাটি শিক্ষাসফর করে এসেছেন। ওই সফরের গল্প উনি প্রায়ই আমাদের শোনান।
আমরা অবাক হয়ে কেবল শুনি আর শুনি।
আর মনে মনে ভাবি, বড় হয়ে একদিন আমরাও যাব শিক্ষাসফরে!
নতুন শহরে, নতুন জনপদে!
কত কিছু দেখব, কত কিছু জানব, কত কিছু শিখব!

সেই দিন দুপুরে সাঈদ ভাই আমাদের একটা ফটো স্টুডিওতে নিয়ে গেলেন। ওখানে আমরা ছবি তুললাম। শার্ট, প্যান্ট, সোয়েটার ও টাই পরে তোলা ওই ছবিটাই ছিল আমাদের জীবনের প্রথম ছবি। দুই সপ্তাহ পর, অপু আর আমার ওই ছবি বৃত্তিলাভের খবরসহ প্রকাশিত হলো দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায়। তখন ওটাই ছিল সবচেয়ে নামিদামি পত্রিকা।
হঠাত করেই আমরা বন্ধুবান্ধবের মধ্যে বিখ্যাত হয়ে গেলাম। জনপ্রিয় হয়ে গেলাম। এখন বিকেলে খেলার মাঠেও আমাদের আলাদা কদর।
ফটো স্টুডিওতে ছবি তোলার পরপরই সাঈদ ভাই আমাদের হাত ধরে নিয়ে এলেন ‘সুধীজন পাঠাগার’-এ।
পাঠাগারের ভেতরে ঢুকে আমরা স্তম্ভিত। আমাদের চোখের সামনে শুধু বই, বই আর বই! একসাথে এত বই আমি বা অপু আমাদের এই জীবনে আগে কখনোই দেখিনি! পাঠ্যবইয়ের বাইরেও যে বইয়ের আলাদা একটা জগত আছে, ওই প্রথম তা জানলাম। আগেই বলেছি নতুন বইয়ের গন্ধ আমার খুব ভালো লাগে। পাঠাগারে এসে পেলাম পুরনো বইয়ের গন্ধ।
ওই গন্ধে মাদকতা যেন আরো অনেক অনেক বেশি!
আমার আর অপুর নেশা ধরল। এই জীবনে ওই নেশা আমাদের আর কাটেনি কখনোই।
পাঠাগারের ভেতরে ঢুকে আমাদের মনে হলো, আমরা যেন চলে এসেছি রূপকথার এক স্বপ্নিল জগতে। ওই জগত্টা বড়ই অদ্ভুত আর বড়ই রহস্যময়। সুদূর কৈশোরেই ওই অদ্ভুত আর রহস্যময় জগত্টাকে বড় ভালোবেসে ফেলেছিলাম। আজও বাসি!
সাঈদ ভাই, আপনার কাছে আমাদের দায় চিরদিনের।
এ দায়ের তো কোনো শোধ নেই!
চলবে……
সিনহা মনসুর।