কবি আমীরুল আরহামের জীবনপথ পরমভাবে আলোকিত কবিতার আলোর সৌন্দর্যে। তাঁর কবিতায় ফুটে ওঠে এক ধরনের কাব্যিক দ্রোহ, যে দ্রোহে তিনি বলে চলেন জীবনের নানা উপাখ্যান। বিশ্ব চরাচরের অসংখ্য নতুন নতুন পথে চলতে চলতে তাঁর কবিতার পংতিমালা আবর্তিত হয় প্রকৃতি মগ্ন মানুষের কাছে। পূর্ণ জ্যোৎস্নার স্রোতে অবগাহিত কবি আমীরুল আরহাম খোলা চোখে দেখে চলেন প্রকৃতি, মানুষের ভালোবাসা আর মানুষের জীবন যন্ত্রণাকে।

কবি আমীরুল আরহামের কাব্যিক সাবলীলতায় সৃষ্টি হয় এক অপূর্ব চিত্রপট যা মনোযোগী পাঠককে নিয়ে যায় আমাদের স্থানিক ও বৈশ্বিক পরতে পরতে লেগে থাকা আবেগীয় সৃষ্টিশীল মানুষের ক্যানভাসের স্বরূপ উপলব্ধিতে। আর এই উপলব্ধিজাত বোধ খুব সহজেই আমাদের নিউরনে স্পর্শ করে আমাদেরকে জাগ্রত করে কবিতার সৌন্দর্যের আস্বাদ গ্রহণে।
কবি আমীরুল আরহাম কবিতার শ্বাশত মনোজগতে হাজার বছর হেঁটে চলা এক পথিক। তিনি কবিতাকে ভালোবেসেছেন স্বচ্ছ এক প্রেমিক মনের আলোয়। তাঁর এই আলোর রশ্মি প্রতিনিয়ত প্রগাঢ় থেকে প্রগাঢ়তর হতে থাকে কবিতাপ্রেমীর গভীরতর হৃদয়ে। সেই সাথে কবির দেহমনের এই দ্যুতিময় আলো তাঁর সাথে প্রতিনিয়ত মনোযোগী পাঠককে অবলীলায় নিয়ে যায় দানিউব থেকে গঙ্গা, পদ্মা, মেঘনা বা যুমনার জলের ধারার মাধুর্য্য অনুধাবন করতে।
– মনিস রফিক

আমীরুল আরহাম, ফ্রান্স অভিবাসী চলচ্চিত্রকার, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার ও কবি। ফ্রান্স ও ইউরোপীয়ন টেলিভিশনে প্রচারিত তার বিভিন্ন ছবির মধ্যে «The Devil’s Water » ফ্রান্সের Etoile de la SCAM পুরস্কৃত। কান চলচ্চিত্র উৎসব ২০১৯-এ সিনেমা পসিটিভ সেকশনে তার নির্বাচিত ছবি «Social Business» স্পেনের ইন্ডি ডক প্রো ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল থেকে ‘বেস্ট সোস্যাল ডকুমেন্টরি ডকুমেন্টরি’ পুরস্কৃত হয়েছে। ফ্রান্স জাতীয় লাইব্রেরি তাঁর দুইটি ছবি «L’eau du diable» ও «les oubliés du Bangladesh» এবং ফ্রান্স বৈদেশিক মন্ত্রণালয় তাঁর একটি ছবি «A banker for the Poor » সংগ্রহে রেখেছে। স¤প্রতি তাঁর «Antemanha» ছবিটি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হচ্ছে।
আমীরুল আরহাম-এর “বৃষ্টিতে ভিজছি”, “দৃষ্টিতে তোমার সমুদ্র ছায়া” দুটি কাব্যগ্রন্থ। শামসুর রাহমানের কবিতা ফরাসি অনুবাদ করেছেন। সরবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয় (র‌্যনে দেকার্ত) থেকে বিশেষ সম্মান পাওয়া তাঁর গবেষণা গ্রন্থ «The forgotten mother language » ১৯৯৯ সালে ফ্রান্স শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শিক্ষানীতি আলোচনা পর্ব নির্দেশিকায় উল্লেখিত।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকায় তাঁর প্রকাশিত কবিতা ছাড়াও, অমিত সাধুখাঁ ও শ্যামলবরণ সাহা সম্পাদিত ‘কেয়াপাতা’, তাজিমুর রহমান সম্পাদিত ‘নৌবত’ ব্লগজিনসহ বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় তাঁর লেখা কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে।

কোজাগরী

বহুকাল দেখি না চাঁদ
পূর্ণিমার কথা ভুলে যাই, কোজাগরী দূরে থাক
অন্ধকারে পথ হাঁটতে হাঁটতে হোঁচট খেয়ে
আকাশের দিকে মুখ যায় যখন
ডালপাতা খিলান চুয়ে
চাঁদের আলোয় তিওল ঝরে মাথায়
চোখ ভরে ওঠে অসংখ্য চাঁদে
তারা হয়ে বেঁচে আছে যারা
চোখের গভীর স্বচ্ছাকাশে
পদ্মার ভরন্ত যৌবনে কেউ মেলেছিল চোখ
মুখ দেখার ছিল না সময় ছিল না সুযোগ
ডুবে গেছে ওদের কেউ অভিমানে
কেউবা হেঁটে গেছে উদ্ধত অহংকারে
বারোতালা ছাদের উপর
কেউবা উঁকি দিয়েছিল শুক্লা দ্বাদশীর রাতে
কচি কলাপাতার নরম আলোয়
কেউবা সন্ধ্যায় ঘুঁটে পোড়া ধোঁয়ায় তুলসী তলায়
পুকুর পাড়ে সদ্য কাটা কামিনী সরু ধানের উঁচু গাদায়
লবন ঝালে আম খেতে খেতে একনিমেষে দেখা
গ্রামের সরু খাল বয়ে যাওয়া নৌকা বুড়ি গঙ্গায়
কালো মেঘে যতোই ঢাকা থাক
সাথে ছিল চাঁদ হাতের তালুতে
চিকচিক তটের বালুতে
‘চাঁদ উঠেছিল গগনে’ দেখেছি জলের গভীরে
তবু বাড়াইনি হাত
ছুঁড়িনি পাথর নিস্তরঙ্গ নীলে
সোঁসোঁ বাতাসের মুখে শব্দ ছিল
হঠাৎ পলক বৃষ্টিতে ছিল আহ্বান
উত্তাল ঢেউয়ে উন্মাদ সমীরণ
পুকুরে গোপনে শাড়ি ভেজা চাঁদ দেখিনি আর
সময়ের হাত ধরে হেঁটে গেছি দূরে
বঙ্গোপসাগর থেকে আতলান্তিক ভূমধ্যসাগরে
মোনাকোর ঝুলন্ত বাগানে
মন্দালিউ ন্যপলসের রবিন্সন সৈকতে
আলোজলে মাখামাখি ঢেউয়ের সাথে, সীগালের ডানায়
রিয়ুনিওন দ্বীপের লাগুনায় রঙিন দোরাদের আঁশে
রূপালি চান্দা মনে করিয়েছে চাঁদ
ঝিলিক দিয়েছিল কেউ রিও দ্য জেনেরোর ফাভেলায়
বোরদোর সবুজ আঙ্গুর ক্ষেতে
কোস্তানোভায় জেলেদের গ্রামে রঙের মেলায়
সমুদ্র ওপার চিকচিক নক্ষত্রখুচি জলের গভীরে
উঁকি দিয়েছিল কেউ
হঠাৎ সেদিন তিয়োলের পত্রপুটে মোড়া
অর্বাচীন অতীত পূর্ণিমা চাঁদ
গ্যালাস্কির অগ্নিতপ্ত আলোয়
ঝলসানো তার দেহপোড়া দাগ দেখে আঁতকে উঠি
হাত ধরে তার সাঁতার কাটতে কাটতে
ডুবে যাই-
ডুবে যাই গভীর অন্ধকারে!

দানিউব

এই! এদিকে আসো! হাত ধরো হাতে!
উপরে তারার আকাশ মাঝখানে পাহাড়
নেমে আসা হাজার বাতি মিটমিট জেগে আছে
তিন নদীর শহর পাশোতে। রাতের বারেতে ফেনাউঠা বেয়ারের বন্যা
প্রবীণ হুইস্কির পবিত্র গন্ধ, ভদকার তীব্র আবেগে
ভিজে যৌবন আনন্দে ডুবুডুবু, উদ্দাম নৃত্তের ছন্দে জীবনের উল্লাস
এসো হাত ধরি, উৎসবে নেচে গেয়ে মেতে উঠি, দানিউব।
খুব, খুব করে নেয়ে ভিজে ভেসে যাবো আজ তোমার সাথে
ওদিকে গহীন বন, বাদামি ভাল্লুক লাল বল্গার ডাক
এদিকে চিৎকার- প্রেমহীন নিঃসঙ্গ তবু বেঁচে থাকার
কোন গল্প নয়, পাশাপাশি দুজন, মুখোমুখি, ক্রজ থেকে নেমে
তোমার গভীরে সাঁতার কাটবো অনুভবে।
পাহাড়ের ঢল বেয়ে সবুজ হলুদ লাল তামাটে গাছ নেমে গেছে জলে রঙিন বাগান
মাক্সিকান হ্যাট ইংগেলম্যান ডেইজি পারপেল হর্স নেটল ব্রিয়ের আর ইয়ারোর সাথে
ঢলাঢলি ইয়ার্কিতে মেতে উঠেছে ইনডিয়ান বøাঙ্কেট। তারি ফাঁকে ফাঁকে
এপারলোঁ কারফে স্টারজিওন বার হরেক মাছ
শিকারের ভিড়ে হাজার পালিকান
মানুষের পাশাপাশি কী অভিনব বসতি তাদের ভালোবাসার
বাড়িতে ছাদে কার্নিশে টকাটক ঠোঁটের টোকায় বেসুরো তবলার সুর
সুদূর আকাশে কালোমেঘ চিরে রূপালি উদ্বাহু রোদ সুন্দর
পাহাড়ের চুড়ায় গির্জার শিখরে বিঁধে থাকা মেঘ যীশুর যন্ত্রণার
আনন্দ বেদনার সবস্মৃতিশোক স্রোত তোমার বুকে
এখানে তোমার বিনীত বিশ্রাম সমাহিত রূপ প্রশ্নে ব্যাকুল
ক্রোশিয়া হারসোগোভিন বসনিয়ায় তুমি কোন প্রিয়জনকে হারিয়ে কাতর চিৎকারে
প্রশ্ন করে যাচ্ছ সেই সৃষ্টি থেকে- আমি জানি না। কিন্তু তোমার প্রাণের সেই ক্রন্দন কলকল তান
কান পেতে শুনছি সপাঁর পিয়ানোয়।
জলের অন্ধকারে
সাঁ স্তেফেন গির্জার সাজানো মোমবাতি ঘিরে
হাজার লক্ষ কফিন তোমার বুকে ভরে বসে আছো বুদাপেস্টের পার্লামেন্টে
কার কাছে মিনতি এই বিচারের, দানিউব?
সেই বিশ্বযুদ্ধের রক্ত বুকে এখনো তুমি কেঁদে ব্যাকুল
এসো। বেঁচে থাকার এই আলোকময় সুন্দরে আমরা বিশ্রাম নিই –
সারবিয়ায় গøুবাক দুর্গের পাশ দিয়ে যেতে যেতে বন্য রাজহাঁস আর গাংচিলের সাথে
প্রাতরাশ সেরে যেই না তুমি নূপুর পায়ে নেচে যাও
সভ্যতার সমস্ত দুর্গন্ধ ময়লা জমাট বেঁধে চিৎকার পাড়ে তোমার বুকে
তুমি আগলে ধরো ধরণী পরম মমতায়, দুকুলে বেঁটে দাও
জননীর হাতভরে শুদ্ধ তৃপ্ত জল
ক্রশিয়া স্লাভনি রোমানিয়ায়
তুমি দোনাও তুমি দুনাজ তুমি দুনা তুমি দুনাভ
দুনারিয়া দুনাই নিশব্ধে বয়ে যাও
গভীর ধ্যানস্ত অন্তঃস্তলে নিঃশব্দ মহিমায় উদাস
প্রশস্ত প্রজ্ঞায় পাহাড়ের গায় দেসেবালুসের দীর্ঘমূর্তির পাশ দিয়ে
বুলগারিয়া থেকে ব্লাক সী।
তোমাকে যতো দেখি ভরে ওঠে বুক আনন্দ বেদনা ও হতাশায়
দুহাতে করুণাভরে তুলে দিলে এতো জল এতো দেশ এতো মানুষের
শিক্ষা তবু নিলোনা দুর্বৃত্ত দল আমাদের দেশে
নীরবে ভেসে যায় কান্নার নোনা জল
গঙ্গা পদ্মা মেঘনা ও যমুনায়।

প্রবাসীর দুদেশ

ও বাড়িতে গাড়ির শব্দ
কিচিরমিচির হাজারজনের
ধোঁয়া-ধুপের গন্ধ বেজায়
তেলেভাজা পথের ধুলো
ভাল্লাগেনা ভাল্লাগেনা!

এ বাড়িতে লোকের অভাব
শব্দগুলো মাটির তলায়
সারাবছর ঠান্ডা কেবল
বড্ড বিভেদ সাদা কালোয়
ভাল্লাগেনা ভাল্লাগেনা!

ও বাড়িতে ঘরে বাইরে
সবার সাথে সবার ভাব
সবাই সবার মোড়ল সাজে
কত্তার সুধু বড্ড অভাব
ভাল্লাগেনা ভাল্লাগেনা!

এ বাড়িতে পাশের ঘরে
কেউ কারুর ও চেনে না
বৃদ্ধগুলো একাই বাঁচে
কুকুর নিয়ে, সন্তানেরা দেখে না
ভাল্লাগেনা ভাল্লাগেনা!

ও বাড়িতে পাহারাদার হয় রাজা
বাড়ির মানুষ পায় সাজা
আমলা মন্ত্রী তরতাজা
গরীব-দুখী ধার ধরে না
ভাল্লাগেনা ভাল্লাগেনা!

এ বাড়িতে জীবন হাঁটে যন্ত্রমাফিক
ভালোবাসা ও মাপের দরে
সারাবছর হিসেব করা
কখন বাইরে কখন ঘরে
ভাল্লাগেনা ভাল্লাগেনা!

ও বাড়িতে আলো-মাটি বাতাসে
সুখ ভাসে বাতাসে
নদীর পাড়ে নরম ঘাসে দুখ থাকে না
এ বাড়িতে ফেরার পথে
ভাল্লাগেনা ভাল্লাগেনা!

এ বাড়িতে অর্থ আছে
অর্থের সুখ আছে
সুখের অসুখ আছে
অসুখের ওষুধ আছে
যন্ত্রসুখে যন্ত্রমেপে মন ভরে না
ভাল্লাগেনা ভাল্লাগেনা!

রাতের কড়চা

মাকড়োসাটি ছুটছে বাঁধছে লালায় ভাঙ্গা ঘর
আটকে আছে পূর্ণিমা চাঁদ মাকড়োসার জালে
ফলের খোঁজে উড়ছে বাঁদুড় গাছে গাছে রাত ভোর
চুঙয়ে পড়ছে রাতের জলরঙ গাছের ডালে ডালে
চোখ মুদে বুঁদ হয়ে শোনে খরগোশ রাতের বিচিত্র সুর
কর্কশ গলায় ডেকে উঠে ময়ুর অসহ্য বিরহের
গভীর স্তব্দতায় জীবনানন্দে মুখ গুঁজে কোয়ালা ঘুমায়
জোনাকি আলোয় সজারুর পায়ে বাজে রাতের নূপুর
হেমন্তের হলুদ পাতা বাতাসে বাজায় ঝরাপাতা সানাই
শিয়ালের আর্তনাদে উপচে পড়ে বন ভরা বেদনায়
রাতের মাহফিলে কাঠ ফড়িংয়ের গানে নাচে ভুতুমপেঁচা
চেঁচিয়ে রাত্রি ছেঁড়ে, ডিম কোলে নিদ্রাহীন ডাহুক
চারিদিক ইঁদুর-অন্ধকার ছুটে যায় পূবে বাঁদুড়ের ডানায়
পাহাড়ের কোলে রৌদ্র রাগে তিনতালে নাচে বিহাগী সুর।

দুপুর
(প্রিয় যামিনীদা, কবিতা যার নিত্যসঙ্গী )

নগ্ননীলাকাশ বনের ‘পর উপুড় হতেই
লাজহীন ধেইধেই রৌদ্রনাচে মগ্ন
সদ্য লাঙলফলা মাটির ফাঁকে
চড়াই ইঁদুর পায়রা শালিক
সানন্দে বেড়ায় খুঁজে নবান্নের ধান।
চইচই হাঁসের পিছে পিছে নগ্ন শিশু
পুকুরের পাড়ে রৌদ্রছায়ায় মিশে যেতেই
পাশফিরে চাষি বাহুবেড়ে মেখে নেয়
ঘামশিক্ত নারীর শরীরের ঘ্রাণ।
এক দমকা বাতাসের রসিকতায়
বুকের আঁচল সামলাতেই
ঘাটফেরতা মেজবৌর কাঁখের কলসি হলো খানখান।

এদিক-ওদিক পাখামেলা প্রজাপতির দিকে চোখ
দলিজের দাবায় বয়োবৃদ্ধ যামিনী যুবক
ভাঙ্গা-দাঁত সামলে
খুকখুক কেশে যায় সারাটি দুপুর।

পাগলি মেয়ে

পাগলি মেয়ে, ঝরা-পাতা শব্দ তুলে কথা বলে
গভীর রাতে তারার দিকে তাকিয়ে দেখে উল্কা পতন
বনে বনে শিশ দিয়ে সে উড়ে বেড়ায়
জোনাক দলে পাখা মেলে সবুজ পাতায় জ্বালায় আগুন
ঠোঁট বিলিয়ে আলাপ করে জ্যোৎস্না আলোয়
বট বৃক্ষের ঝুরি ধরে দুলতে থাকে পেঁচার সাথে
সমাজ ছেড়ে সুখ খোঁজে সে পশুপাখি, গাছের কাছে
দিনের আলোয় অন্ধ চোখ পষ্ট দেখে গভীর রাতে
কোন পাখিটার বাসা ভাঙ্গা, কোন খরগোশ বাচ্চা দেবে
কোন ফুলটির গন্ধ বেশি কোন মুকুলটি মেলবে কবে
কোন ডালটি ভাঙলো ঝড়ে কোন ফুলটি গেলো ঝরে
বন কি শুধু, আকাশ সুদ্ধু ঢুকে পড়ে চোখের মধ্যে
অন্ধকারের গন্ধগুলো নাকে ঢোকে
পাতার গন্ধ, ফুলের গন্ধ, শিশু পাখির গায়ের গন্ধ
শিশির ভেজা ঘাসের গন্ধ, বৃষ্টিভেজা মাটির গন্ধ- সুখ পায় সে
আরেক গন্ধে কষ্ট কেবল গলা খেঁকে বমি করে
ভুলতে চায় সে মাটির দিকে দৃষ্টিগুলো চাপা দিয়ে
যে-দেখা তার মানুষগুলো তাদের থেকে পালিয়ে বেড়ায়
কুকুর বিড়াল গরু ছাগল সবাই যেন মিত্র তার
পুরুষগুলোর ভয়ে কেবল ভালোবাসে অন্ধকার
পাটপচা কাদামাটি গায়ে মেখে পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকে
পাড়ার বৌ ডেকে তারে কানসি ভরে খাবার দেয়
খাবার কি সে একা খায়, চড়ুই পাখি, হাঁস-মুরগি শালিক-কবুতর সঙ্গে নেয়
পাড়ার কিছু যুবক ছেলে খেলতে ডাকে সকাল সাঁজে
বিশ-একুশের হাসিখুশি কালো মেয়ে চোখের মধ্যে মানুষ খোঁজে
লোকে বলে পাগলি মেয়ে বড্ড অবুঝ, কেউ নেই তার এ দুনিয়ায়
বনের পাখি কীট পতঙ্গ কুকুর বিড়াল সবাই নাকি তার পরিবার
কলতলাতে কলসি ভ’রে গল্প তোলে
বন্যার জলে আটকে ছিল পাট ক্ষেতে সে রাত ভ’রে
কেউ বলে তার জন্ম নাকি বিধবার ঘরে
বাঁধা ছিল মাটির তলায় অন্ধকারে
কেউ বলে তার বাবা ছিল না
নাবালিকা মা নাকি তার বিষ খেয়েছে শিশুকালে
যে যাই বলুক পাগলি মেয়ে দেখতে ভারি
কালো চোখের মধ্যে তার হাজার ক’টি তারা জ্বলে
কেউ বলে জ্বীন-পরী সে, সাদা ঘোড়ায় উড়ে বেড়ায়
কেউ বলে সে সাদা বকের বেশে নাকি জ্যান্ত পুঁটি ধরে খায়
কুয়াশা চাদর জড়িয়ে বুকে সবুজ ক্ষেতে হেঁটে চলে
পাগলি মেয়ে এসব শুনে হি হি হা হা হেসেই মরে-
খিলখিলিয়ে হেসেই মরে- লোকে তারে পাগলি বলে।