অনলাইন ডেস্ক : ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ায় তেল বাণিজ্যে ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতেও তৈরি হয়েছে টালমাটাল অবস্থা। এমন পরিস্থিতিতে আরও শঙ্কার কথা জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটি ২০২৬ সালের জন্য প্রবৃদ্ধির হার জানুয়ারির ৩.৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩.১ শতাংশ করেছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি চলতি বছরে ৪.৪ শতাংশে পৌঁছানোর পর আগামী বছরে ৩.৭ শতাংশে নেমে আসবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ।
মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) প্রকাশিত বিশ্ব অর্থনৈতিক পূর্বাভাস প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু না হলে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়ানো যেত। যুদ্ধের আগ পর্যন্ত প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা ইতিবাচক প্রভাব ফেলছিল। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ এবং ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় পরিস্থিতি পূর্ণমাত্রার সংঘাতে রূপ নেয়। এতে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং অনিশ্চয়তা বেড়ে যায়। এই কারণে সংস্থাটি তাদের স্বাভাবিক পূর্বাভাস পদ্ধতির পরিবর্তে বিকল্প পূর্বাভাস ব্যবহার করেছে।
এই বিকল্প পূর্বাভাসে অনুমান করা হয়েছে, যুদ্ধ ও এর পরিধি সীমিত হয়ে আসবে এবং ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যাঘাত কমে আসবে। তবে সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, যদি মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামো আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি চলতি বছরে ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে এবং ২০২৭ সালের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের ওপরে চলে যেতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এই যুদ্ধের প্রভাব সব দেশের ওপর সমান নয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি বেশি কমার আশঙ্কা রয়েছে, যেখানে এই বছরের পূর্বাভাস গড়ে ০.৩ শতাংশ পয়েন্ট কমানো হয়েছে। উন্নত দেশগুলোর ক্ষেত্রে প্রভাব তুলনামূলক কম হলেও যুদ্ধ বাড়লে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষতি হতে পারে প্রায় দ্বিগুণ।
মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিমা অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা
ইরানের অর্থনীতি এ বছর ৬.১ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে। পাশাপাশি কাতার ও ইরাকের অর্থনীতি যথাক্রমে ৮.৬ শতাংশ ও ৬.৮ শতাংশ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কুয়েত ও বাহরাইনের অর্থনীতিও এ বছর যথাক্রমে ০.৬ শতাংশ ও ০.৫ শতাংশ কমতে পারে, যদিও ২০২৭ সালে তারা আবার প্রবৃদ্ধিতে ফিরতে পারে বলে উল্লেখ করেছে আইএমএফ।
এছাড়া যুদ্ধের প্রভাব পড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বেও। পূর্বাভাস অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধি কমে ২.৩ শতাংশ হতে পারে। আইএমএফ বলছে, ইরান যুদ্ধের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে যুক্তরাজ্যের প্রবৃদ্ধি। তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরে যুক্তরাজ্যের প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস কমে দশমিক আট শতাংশে নেমেছে। যুদ্ধ শুরু আগে গত জানুয়ারিতে যা ছিল ১.৩ শতাংশ।
এছাড়া পুরো ইউরোপ অঞ্চলের প্রবৃদ্ধি কমে এ বছর ১.১ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ১.২ শতাংশে নেমে আসবে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি ও স্পেনের প্রবৃদ্ধিও কমানো হয়েছে প্রতিবেদনে। তথ্য অনুযায়ী, জার্মানির প্রবৃদ্ধি কমে ০.৮ শতাংশ, ফ্রান্সের ০.৯ শতাংশ, ইতালির ০.৫ শতাংশ এবং স্পেনের ২.১ শতাংশ হতে পারে।
এশিয়ায় মিশ্র চিত্র
চীনের প্রবৃদ্ধি সামান্য কমে ৪.৪ শতাংশ হতে পারে। তবে ভারতের প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৬.৫ শতাংশ এবং রাশিয়ার প্রবৃদ্ধি বেড়ে ১.১ শতাংশ হতে পারে। পাশাপাশি তুরস্কের অর্থনীতি ৩.৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে, যা আগের পূর্বাভাসের তুলনায় কম। দেশটিতে মূল্যস্ফীতি ২০২৬ সালে ২৮.৬ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ২১.৪ শতাংশে থাকতে পারে। বেকারত্বও আট শতাংশের বেশি থাকতে পারে।
বাণিজ্য উত্তেজনা ও প্রতিরক্ষা ব্যয়
বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য উত্তেজনা বাড়ছে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের সরবরাহ ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে নতুন বিরোধ দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশ প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াচ্ছে। এতে স্বল্প মেয়াদে অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাড়লেও মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে, আর্থিক ভারসাম্য দুর্বল হতে পারে এবং সামাজিক খাতে ব্যয় কমে যেতে পারে, যা তৈরি করতে পারে নতুন অস্থিরতা।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে দ্রুত পরিবর্তন এবং অনিশ্চিত মুনাফার কারণে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। যদি এই খাতে প্রত্যাশা হঠাৎ বদলে যায়, তাহলে বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে বড় পতন এবং বিনিয়োগে ধস নামতে পারে বলে জানিয়েছে আইএমএফ।
সূত্র: আনাদোলু
