ই-পেপার

এত কিছু করেও নোবেল পেলাম না, ক্ষোভ ট্রাম্পের

নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট

আপডেট: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ২১:৫৮
১৭ ভিউ
এত কিছু করেও নোবেল পেলাম না, ক্ষোভ ট্রাম্পের

ছবি সংগৃহীত: ফাইল ছবি

অনলাইন ডেস্ক : নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষোভ আবারও প্রকাশ্যে এসেছে। পুরস্কারজয়ী নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাইয়ের পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। ট্রাম্পের দাবি, বিশ্বে একাধিক সংঘাতের অবসান ঘটানোসহ নানা উদ্যোগ নেওয়ার পরও তাকে পুরস্কার না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নরওয়ের জন্য দীর্ঘস্থায়ী কলঙ্ক হয়ে থাকবে।

শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের সিরাকিউজে এক সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় এ নিয়ে অসন্তোষ জানান ট্রাম্প। নাভি পিল্লাইকে ‘রহস্যময় ব্যক্তি’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, পিল্লাই কী করেছেন, তা তার জানা নেই। একই সঙ্গে নরওয়ের উদ্দেশে তিনি বলেন, তাকে পুরস্কার না দেওয়ার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র ভুলে যাবে না।

এর আগে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টেও নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ার বিষয়ে হতাশা প্রকাশ করেন ট্রাম্প। সেখানে তিনি দাবি করেন, আটটি যুদ্ধের অবসান ঘটিয়েছেন এবং আরও দুটি সংঘাতের সমাধানের কাছাকাছি পৌঁছেছেন। এ ছাড়া ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্ত করা এবং ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখার মতো পদক্ষেপের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

ট্রাম্পের ভাষ্য, এসব উদ্যোগের পরও তাকে কিংবা যুক্তরাষ্ট্রকে নোবেল শান্তি পুরস্কার না দেওয়ার সিদ্ধান্ত বিস্ময়কর। ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি নিয়েও নিজের সাফল্যের দাবি করেন তিনি। দেশটির একজন কর্তৃত্ববাদী নেতাকে আটক করার কথাও পোস্টে উল্লেখ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

তবে ট্রাম্পের আটটি সংঘাতের অবসান ঘটানোর দাবির সবকটির সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির মিল নেই। কয়েকটি সংঘাতের অবসান নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন বিরোধ নিষ্পত্তিতে সংশ্লিষ্ট দেশ ও অন্যান্য পক্ষেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

প্রায় ১০ মিনিটের বক্তব্যে ট্রাম্প আবারও বলেন, নোবেল শান্তি পুরস্কার তার প্রাপ্য ছিল। তাকে পুরস্কার না দেওয়ার সিদ্ধান্তকে নরওয়ে ও সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের জন্য বিব্রতকর বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার বিষয়ে ট্রাম্পের আগ্রহ নতুন নয়। এর আগে বিভিন্ন সময়ে নিজেকে এ পুরস্কারের যোগ্য দাবিদার হিসেবে তুলে ধরেছেন তিনি। পুরস্কার নিয়ে নরওয়ের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টিও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। দেশটির অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ এবং প্রধানমন্ত্রীর কাছে বার্তা পাঠানোর ঘটনাও আলোচনায় এসেছে।

তবে নরওয়েজীয় নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান ইয়োরগেন ওয়াটনে ফ্রাইডনেস শনিবার বলেন, পুরস্কার দেওয়ার ক্ষেত্রে কমিটি নরওয়ে সরকারের কাছ থেকে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেয়। আলফ্রেড নোবেলের উইলে নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করে যোগ্য ব্যক্তিদের সম্মানিত করাই কমিটির দায়িত্ব।

ট্রাম্পের অভিযোগের বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য না করে ফ্রাইডনেস বলেন, সাহস ও সততার সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইনভিত্তিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় যারা অবদান রাখেন, তাদের স্বীকৃতি দেওয়াই এ পুরস্কারের উদ্দেশ্য। শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে তুলতে হলে বিশ্বকে সেই লক্ষ্যেই এগিয়ে যেতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

নরওয়েজীয় নোবেল কমিটি দেশটির সরকারের কোনো অংশ নয়। যদিও সংসদ সদস্যদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে কমিটির সদস্যদের নিয়োগ দেওয়া হয়।

এ বছর নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন আইনজ্ঞ ও জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই। আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠা এবং মানবাধিকার রক্ষায় দীর্ঘদিনের ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে তাকে এ সম্মান দেওয়া হয়েছে।

দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের কর্মীদের আইনি সহায়তা দেওয়া থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় দায়িত্ব পালন বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করেছেন পিল্লাই। ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডায় সংঘটিত গণহত্যার বিচারপ্রক্রিয়ায় গঠিত আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালেও নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

গত বছর গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড নিয়ে জাতিসংঘের একটি তদন্ত কমিশনের নেতৃত্ব দেন পিল্লাই। ওই কমিশন ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। তবে ইসরায়েল এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।

বর্তমানে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে চলমান একটি মামলায় বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন পিল্লাই। মামলাটিতে রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।

পুরস্কার পাওয়ার খবরের পর প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে পিল্লাই রসিকতা করে বলেন, উপস্থিত ব্যক্তিরা আরও বেশি করতালি দিলে হয়তো তিনি পুরস্কারটি ট্রাম্পের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারবেন।

পরে যুদ্ধাপরাধের শিকার ব্যক্তিদের উদ্দেশে পুরস্কারটি উৎসর্গ করেন তিনি। তার সাহসের প্রশংসা করায় বিস্ময় প্রকাশ করে পিল্লাই বলেন, সত্য কথা বলার জন্য সাহসের প্রয়োজন হবে কেন?

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপেরও সমালোচনা করেন তিনি। তার মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়াকে দুর্বল করে দিতে পারে।

নাভি পিল্লাইয়ের নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার খবর প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে ট্রাম্প প্রশাসন।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি তৈরি করছে এমন একটি আদালতের কার্যক্রম ঠেকাতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

অসলোভিত্তিক পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট অসলো-এর ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হাকন গেরলো মনে করেন, পিল্লাইকে পুরস্কার দেওয়ার দিনই আইসিসির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার ঘটনা আন্তর্জাতিক আইন রক্ষার গুরুত্ব সামনে এনেছে।

গেরলোর ভাষ্য, নোবেল কমিটির সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক আইন ও এ আইন রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর মতে, সিদ্ধান্তটি সাহসী হলেও এর বিপরীতে আসা প্রতিক্রিয়া উদ্বেগজনক।

এদিকে ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়ার পক্ষে বিভিন্ন সময়ে কয়েকটি দেশ ও ব্যক্তি প্রচার চালিয়েছেন। গত বছরের শান্তি পুরস্কারজয়ী ভেনেজুয়েলার বিরোধী রাজনীতিক মারিয়া কোরিনা মাচাদোও চলতি বছরের জানুয়ারিতে নিজের পদক ট্রাম্পকে দিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর কয়েক সপ্তাহ আগে ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার ঘটনা ঘটে।

তবে নোবেল কমিটির নিয়ম অনুযায়ী, একবার পুরস্কার ঘোষণা করা হলে তা বাতিল করা, ভাগ করে দেওয়া কিংবা অন্য কারও কাছে হস্তান্তর করার সুযোগ নেই।

সূত্র: ওয়াশিংটন পোস্ট