ই-পেপার

নিউইয়র্কে শিশুসহ ব্যক্তিকে আইসিইর গুলি, শহরজুড়ে বিক্ষোভ

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে গাড়িতে পাঁচ বছর বয়সী

আপডেট: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২২:৩৬
৬ ভিউ
নিউইয়র্কে শিশুসহ ব্যক্তিকে আইসিইর গুলি, শহরজুড়ে বিক্ষোভ

ছবি সংগৃহীত: ফাইল ছবি

অনলাইন ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে গাড়িতে পাঁচ বছর বয়সী এক শিশুকে নিয়ে বসে থাকা এক ব্যক্তিকে গুলি করেছেন দেশটির অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থার (আইসিই) এক কর্মকর্তা। বৃহস্পতিবার ব্রঙ্কসের মার্বেল হিল এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। গুলিতে ওই ব্যক্তি আহত হলেও শিশুটি শারীরিকভাবে অক্ষত রয়েছে বলে জানিয়েছেন নগরীর মেয়র জোহরান মামদানি। কাতারভিত্তিক বার্তাসংস্থা আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।

ঘটনার পর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নিউইয়র্কে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী কঠোর পদক্ষেপের বিপজ্জনক দিকটি এই ঘটনা আবারও সামনে এনেছে। এ সময় পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের কয়েক দফা ধস্তাধস্তিও হয়।

মেয়র মামদানি এ ঘটনাকে ‘অবিবেচনাপ্রসূত ও অত্যন্ত গুরুতর’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে তিনি জানান, বৃহস্পতিবার ওই এলাকায় আইসিই কর্মকর্তারা গাড়িসহ এক ব্যক্তি ও পাঁচ বছর বয়সী শিশুকে ঘিরে ফেলেন। এরপর তাকে লক্ষ্য করে একাধিক গুলি ছোড়া হয়।

মামদানি বলেন, তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং নিউইয়র্কে আইসিইর সব ধরনের অভিযান বন্ধের দাবি জানাবেন।

তিনি বলেন, ‘আইসিই কর্মকর্তারা আমাদের জনগোষ্ঠীকে আতঙ্কিত করবেন, আর আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকব তা হতে পারে না।’

ঘটনাস্থলে সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের মামদানি আরও বলেন, ‘আজকের গুলির ঘটনা আমাদের দীর্ঘদিনের জানা সত্যকে আরও ভয়াবহভাবে সামনে এনেছে। আইসিই জবাবদিহি ছাড়াই কাজ করে, পুরো দেশে বিশৃঙ্খলা ও আতঙ্ক ছড়ায়। তারা যত মানুষকে বাঁচানোর দাবি করেছে, তার চেয়ে অনেক বেশি প্রতিবেশীকে হত্যা করেছে।’

এ সময় তিনি সংস্থাটি বিলুপ্ত করারও দাবি জানান।

গুলি ছোড়ার বিবরণ

যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ (ডিএইচএস) জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টার দিকে ব্রঙ্কস এলাকায় একটি ‘নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক অভিযান’ চালাচ্ছিলেন আইসিই কর্মকর্তারা। তাদের লক্ষ্য ছিলেন অপরাধে দণ্ডিত ২৮ বছর বয়সী এক ডোমিনিকান নাগরিক। নগর পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই ব্যক্তির নাম অস্কার বেলগাল।

ডিএইচএসের ভাষ্য, অভিযানের সময় এক কর্মকর্তা অস্ত্র থেকে গুলি ছোড়েন এবং ওই ব্যক্তি আহত হন। ঘটনাটি তদন্তাধীন রয়েছে বলেও জানিয়েছে বিভাগটি।

নিউইয়র্ক পুলিশের কমিশনার জেসিকা টিশ জানান, বেলগাল গাড়িটি পার্কিংয়ের জায়গায় ঢোকাচ্ছিলেন। এ সময় সাদাপোশাকে থাকা এক ফেডারেল কর্মকর্তা হাতে অস্ত্র নিয়ে তার কাছে যান। পরে একইভাবে পোশাক পরা আরেক কর্মকর্তা সেখানে উপস্থিত হন।

টিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বেলগাল গাড়িটি সামনে এগিয়ে নিতে শুরু করলে অন্তত একজন কর্মকর্তা সাতটি গুলি ছোড়েন। এতে তাঁর বাঁ কানের নিচে গুলি লাগে।

নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগ জানিয়েছে, আহত ব্যক্তি তখনো সচেতন ছিলেন এবং তাকে কাছের একটি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। শিশুটি অক্ষত রয়েছে এবং পরে এক আত্মীয়ের কাছে ছিল বলে নিশ্চিত করেছেন পুলিশ কমিশনার।

আইসিইর অভিযান বন্ধের দাবি

নিউইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোকুল জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার রাতে তিনি ট্রাম্প ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তামন্ত্রী মার্কওয়েন মুলিনের সঙ্গে কথা বলেছেন।

এক বিবৃতিতে হোকুল বলেন, ‘নিউইয়র্কবাসীর পক্ষ থেকে আমি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছি এবং রাজ্যে আইসিইর অভিযান বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ঘটনার প্রকৃত তথ্য উদ্‌ঘাটন ও সত্য নিশ্চিত করতে গুলির ঘটনার সব বডি ক্যামেরার ভিডিও জনসমক্ষে প্রকাশের অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।

এলাকাটির প্রতিনিধিত্বকারী নগর পরিষদের সদস্য কারমেন দে লা রোসা বলেন, ‘আমরা গভীরভাবে শোকাহত এবং ক্ষুব্ধ।’

আইসিইকে ঘিরে বাড়ছে বিতর্ক

যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনবিরোধী অভিযান ও আইসিইর কর্মকাণ্ড নিয়ে কয়েক মাস ধরেই সমালোচনা বাড়ছে। গত জানুয়ারিতে মিনিয়াপোলিসে ফেডারেল অভিবাসন কর্মকর্তাদের গুলিতে দুই মার্কিন নাগরিক নিহত হন।

৭ জানুয়ারি তিন সন্তানের মা ৩৭ বছর বয়সী রেনি নিকোল গুডকে আইসিইর এক কর্মকর্তা গুলি করে হত্যা করেন। পরে ৩৭ বছর বয়সী নিবিড় পরিচর্যা বিভাগের নার্স অ্যালেক্স প্রেটিও এক মার্কিন সীমান্তরক্ষী কর্মকর্তার গুলিতে নিহত হন।

গুডের মৃত্যুর পর ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা তাকে ‘অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসী’ বলে আখ্যা দেন। তবে ঘটনার ভিডিওতে তিনি এক কর্মকর্তাকে গাড়িচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

এসব হত্যাকাণ্ডের তদন্ত থেকে স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে সরিয়ে দেয় কেন্দ্রীয় সরকার। নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে তদন্তের দাবিও প্রত্যাখ্যান করা হয়। একই সঙ্গে মিনেসোটায় আরও শত শত ফেডারেল কর্মকর্তা পাঠানো হয়। সেখানে তাদের সংখ্যা বেড়ে প্রায় তিন হাজারে দাঁড়ায়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের শত শত শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

আইসিইর বিরুদ্ধে সমালোচনার জন্য গণমাধ্যমের অসম্পূর্ণ ও অন্যায্য সংবাদ পরিবেশনকে দায়ী করেছেন ট্রাম্প। সংস্থাটি যেসব ‘সহিংস অপরাধীকে’ গ্রেপ্তার করে, তা জনসমক্ষে তুলে ধরতে তিনি ডিএইচএস ও আইসিইকে আহ্বান জানিয়েছেন।

বাড়ছে আইসিইর জনবল ও বাজেট

ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরে আইসিইর জনবল দ্বিগুণ হয়েছে। জানুয়ারি নাগাদ সংস্থাটির কর্মকর্তার সংখ্যা ২২ হাজার ছাড়িয়ে যায়। বর্তমানে এটি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি অর্থ বরাদ্দ পাওয়া ফেডারেল আইন প্রয়োগকারী সংস্থা।

গত বছর ট্রাম্প স্বাক্ষরিত একটি কর আইনের আওতায় চার বছরে সংস্থাটির জন্য প্রায় ৭৫ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বছরে ১০ লাখ মানুষকে বহিষ্কারের দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে আইসিইকে।

নিউইয়র্কে সর্বশেষ গুলির ঘটনা অভিবাসন অভিযান, আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের জবাবদিহি এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলমান বিতর্ককে আরও জোরালো করেছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঘটনাটির সব পরিস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।