যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়াসহ বেশ কয়েকটি পশ্চিমা দেশ
ছবি সংগৃহীত: ফাইল ছবি
অনলাইন ডেস্ক : যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়াসহ বেশ কয়েকটি পশ্চিমা দেশ ফিলিস্তিনিদের অধিকার হরণ ও পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি স্থাপনের পক্ষে অবস্থান নেওয়া ইসরায়েলের উগ্রপন্থি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছিল। অথচ ইউরোপীয় ইউনিয়ন যখন তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক সেই সময়েই ভারতে তাকে উষ্ণ সংবর্ধনা দেওয়া হয়। নয়াদিল্লিতে বাণিজ্য চুক্তি সই, মুম্বাই স্টক এক্সচেঞ্জ পরিদর্শন এবং গুজরাটে বিনিয়োগ কেন্দ্র ঘুরে দেখার মাধ্যমে তিনি এক ব্যাপক সফর সম্পন্ন করেন।
ইসরায়েল যখন গাজায় ভয়াবহ সামরিক অভিযান চালিয়ে প্রতিনিয়ত শত শত মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে, ঠিক তখনই ভারতের এই উষ্ণ অভ্যর্থনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যেখানে ইউরোপীয় মিত্ররাও নেতানিয়াহু সরকার থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখছে, সেখানে ভারতের বর্তমান নেতৃত্ব নরেন্দ্র মোদির সরকার ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের যুদ্ধাপরাধের পরোয়ানা মাথায় নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একঘরে হয়ে পড়া ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে দেখা করতে জেরুজালেম সফর করেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সেখানে নেতানিয়াহু তাকে ‘ভাই’ ও ‘মহান বন্ধু’ বলে সম্বোধন করেন।
ঐতিহাসিকভাবে ফিলিস্তিনের একনিষ্ঠ সমর্থক ছিল ভারত। তবে ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ও তার দল বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে এই পররাষ্ট্রনীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, মোদির হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বয়ানের সঙ্গে ইসরায়েলের উগ্রপন্থি নীতির এক অদ্ভুত মিল রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ভারতের দক্ষিণপন্থি মহল ইসলামী উগ্রবাদের জুজুর ভয় দেখিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার পক্ষে যুক্তি দিয়ে আসছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর মোদি অবিলম্বে সেই হামলার তীব্র নিন্দা জানান এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির কথা বলেন। এর ফলে ভারতের ঘরোয়া রাজনীতিতে মুসলিমবিরোধী মনোভাবকে পুঁজি করে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা সহজ হয়েছে।
এর বাইরেও দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং কৌশলগত অংশীদারত্ব অত্যন্ত শক্তিশালীরূপে বিকশিত হয়েছে। মোদির আমলেই ভারত ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ক্রেতা রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। অথচ ইউরোপের অন্তত ১১টি দেশ ও কানাডা ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিলেও, ভারত কেবল যুদ্ধবিরতির পক্ষে মৃদু বুলি আওড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে এবং কোনো কঠোর নৈতিক বা নীতিনিষ্ঠ অবস্থান নেয়নি।
ভারতের এই পলিসি পরিবর্তন অবশ্য এক দিনে হয়নি। ১৯৪৭ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনের বিরোধিতাকারী ভারত দীর্ঘদিন ফিলিস্তিনপন্থি অবস্থান ধরে রাখলেও ১৯৯২ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পর থেকেই সম্পর্ক ধীরে ধীরে উষ্ণ হতে শুরু করে। তবে অতীতে কংগ্রেস সরকারগুলো মুসলিম ভোটারদের কথা ভেবে ফিলিস্তিনকে সমর্থন করলেও, বর্তমান মোদি সরকার সেই অবস্থান পুরোপুরি বদলে দিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে কৌশলগত ও রাজনৈতিক সখ্যতাকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। গাজায় রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও আন্তর্জাতিক নিন্দা সত্ত্বেও নেতানিয়াহুর সঙ্গে মোদির এই কৌশলগত মিত্রতা অটুট রয়েছে।