ই-পেপার

ক্যালিফোর্নিয়ায় বিলিয়নেয়ারদের সম্পদে ৫ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে বিলিয়নেয়ারদের নিট সম্পদের ওপর

আপডেট: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৭:৪৪
১০ ভিউ
ক্যালিফোর্নিয়ায় বিলিয়নেয়ারদের সম্পদে ৫ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব

ছবি সংগৃহীত: ফাইল ছবি

অনলাইন ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে বিলিয়নেয়ারদের নিট সম্পদের ওপর এককালীন ৫ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ‘প্রপোজিশন ৪০’ নামের এই প্রস্তাবে প্রায় ২০০ বিলিয়নেয়ারের সম্পদের ওপর কর আরোপ করে স্বাস্থ্যসেবা খাতের অর্থসংকট মোকাবিলায় ১০ হাজার কোটি ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে এ বিষয়ে ভোট দেবেন অঙ্গরাজ্যের বাসিন্দারা। সমর্থকদের দাবি, এতে সম্পদ বৈষম্য কমানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবার অর্থায়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তবে বিরোধীদের আশঙ্কা, এই করের কারণে ধনকুবেররা অঙ্গরাজ্য ছেড়ে চলে গেলে বিনিয়োগ ও রাজস্ব আয় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

ক্যালিফোর্নিয়া যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম অর্থনীতির অঙ্গরাজ্য এবং বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির অধিকারী। এখানে অপরাহ উইনফ্রে, মেটার প্রধান মার্ক জাকারবার্গ, রিয়ালিটি টিভি তারকা কিম কারদাশিয়ান ও চলচ্চিত্র নির্মাতা জর্জ লুকাসের মতো ধনী ও বিখ্যাত ব্যক্তিদের বসবাস। একই সঙ্গে অঙ্গরাজ্যটিতে গৃহহীন মানুষের সংখ্যাও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সর্বোচ্চ এবং সম্পদ বৈষম্যও ব্যাপক। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলির পাবলিক পলিসির অধ্যাপক ফ্রান্সেস্কো ট্রেব্বি বলেন, প্রস্তাবটি সম্পদ বণ্টনের সর্বোচ্চ স্তরে থাকা অতি-ধনীদের লক্ষ্য করে আনা প্রথম বিলিয়নেয়ার কর। তাঁর মতে, এটি ক্যালিফোর্নিয়ার সম্পদ বৈষম্য কমাতে সহায়তা করতে পারে।

প্রস্তাবটির সমর্থকদের দাবি, অতি-ধনীরা তাদের সম্পদের ন্যায্য অংশ কর হিসেবে দিলে অঙ্গরাজ্যের বাজেটের ঘাটতি মোকাবিলা সহজ হবে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কর ও ব্যয়সংক্রান্ত বিস্তৃত বিলের কারণে স্বাস্থ্যসেবা খাতে ফেডারেল তহবিল কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রস্তাবটির পক্ষে প্রচারণা চালানো সার্ভিস এমপ্লয়িজ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন-ইউনাইটেড হেলথকেয়ার ওয়ার্কার্স ওয়েস্টের চিফ অব স্টাফ সুজান হিমেনেজ বলেন, স্বাস্থ্যসেবা খাতে সম্ভাব্য অর্থসংকট মোকাবিলায় এই কর একটি স্বল্পমেয়াদি সমাধান হতে পারে। তিনি বিবিসিকে বলেন, কোনো পদক্ষেপ না নিলে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত এটি অন্তর্বর্তী সমাধান হিসেবে কাজ করবে।

প্রস্তাবটির পক্ষে বিলিয়নেয়ারদের মধ্যেও সমর্থন রয়েছে। এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং কর দেওয়ার বিষয়ে আপত্তি নেই বলে জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিবিএসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আয় যত বেশি হবে, করও তত বেশি দিতে হবে—এতে আমার সমস্যা নেই। ‘আমেরিকান ড্রিম’-এর উদাহরণ হিসেবেও উল্লেখ করেন। ব্যবসায়ী টম স্টেয়ারও করটির পক্ষে ভোট দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। চলতি বছরের শুরুতে ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ব্যর্থ হওয়া স্টেয়ার বলেন, প্রস্তাবটির খসড়া তৈরির পদ্ধতিতে সমস্যা থাকলেও অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত বাসিন্দাদের সুরক্ষায় এটি প্রয়োজনীয়। ভারমন্টের সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সও প্রস্তাবটির পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছেন। লস অ্যাঞ্জেলেসের এক সমাবেশে তিনি বলেন, বিলিয়নেয়াররা ঊনবিংশ শতাব্দীর রাজাদের মতো শাসন করার অধিকারকে ঈশ্বরপ্রদত্ত বলে মনে করে। ৩ নভেম্বর আমরা বড় ধরনের বার্তা পেতে পারি।

তবে প্রস্তাবটি বিলিয়নেয়ার ও রাজনৈতিক নেতাদের বিরোধিতার মুখেও পড়েছে। গুগলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা সার্গেই ব্রিন সম্পদ করের বিরোধিতা করা রাজনৈতিক উদ্যোগে ১০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ দিয়েছেন বলে লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস জানিয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসামও প্রস্তাবটির বিরোধিতা করছেন। তাঁর আশঙ্কা, কর আরোপ করা হলে ধনী ব্যক্তিরা অঙ্গরাজ্য ছেড়ে চলে যেতে পারেন এবং এতে গুরুত্বপূর্ণ আয়কর রাজস্ব হারাবে সরকার। বার্কলে ইনস্টিটিউট অব গভর্নমেন্টাল স্টাডিজ ও লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমসের সেপ্টেম্বরের জরিপে দেখা গেছে, সম্ভাব্য ভোটারদের ৪৫ শতাংশ প্রস্তাবটির পক্ষে, ৪২ শতাংশ বিপক্ষে এবং ১৩ শতাংশ তখনো সিদ্ধান্ত নেননি। প্রস্তাবটি পাস করতে অঙ্গরাজ্যের ভোটারদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন প্রয়োজন।

প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত ক্যালিফোর্নিয়ায় বসবাসকারী এবং অন্তত ১০০ কোটি ডলারের নিট সম্পদের মালিকদের ওপর করটি কার্যকর হবে। এ কর এড়াতে অঙ্গরাজ্যের কয়েকজন বিলিয়নেয়ার ইতিমধ্যে চলে গেছেন বলে জানা গেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন গুগলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজ ও সার্গেই ব্রিন, ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট পিটার থিল, উবারের সাবেক প্রধান নির্বাহী ট্র্যাভিস কালানিক এবং হ্যাঙ্কি গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ডন হ্যাঙ্কি। লস অ্যাঞ্জেলেসের বাসিন্দা হ্যাঙ্কি ফোর্বসকে বলেন, ক্যালিফোর্নিয়ায় আমার প্রতিষ্ঠান কয়েক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান করেছে এবং মুনাফা ভাগাভাগির ব্যবস্থাও রয়েছে। তবু প্রস্তাবিত করের কারণে আমাকে নেভাডায় চলে যেতে হয়েছে।

মেটার প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গও প্রস্তাবিত করের কারণে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে তার প্রধান বাসস্থান সরিয়ে নেওয়ার কথা ভাবছিলেন বলে গত মাসে কোম্পানির বোর্ডকে জানিয়েছেন। তাকে অঙ্গরাজ্যে রাখার জন্য মেটা নতুন শেয়ার চুক্তিতে সম্মত হয়েছে। এর আওতায় ২০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদের মালিক জাকারবার্গ কোম্পানিতে আরও শেয়ার পাবেন। প্রস্তাবটি পাস হলে তার কয়েক বিলিয়ন ডলারের কর দিতে হতে পারে; কিছু হিসাব অনুযায়ী, এ অঙ্ক ১২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। ডোরড্যাশের সহ-প্রতিষ্ঠাতা অ্যান্ডি ফ্যাংও প্রস্তাবটির সমালোচনা করেছেন। তার সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১৬০ কোটি ডলার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন, এ ধরনের প্রস্তাবের মুখে অঙ্গরাজ্য ছেড়ে যাওয়ার পরিকল্পনা না করা দায়িত্বজ্ঞানহীন হবে।

যুক্তরাষ্ট্রে আয় বৈষম্য গত তিন দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি পৌঁছেছে। ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে দেশটির মোট সম্পদের প্রায় ৩২ শতাংশ ছিল শীর্ষ ১ শতাংশ পরিবারের হাতে। ক্যালিফোর্নিয়াতেও বৈষম্যের মাত্রা ঐতিহাসিক সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি। পাবলিক পলিসি ইনস্টিটিউট অব ক্যালিফোর্নিয়ার এক জরিপে দেখা গেছে, অঙ্গরাজ্যের ৭২ শতাংশ বাসিন্দা মনে করেন, ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান বাড়ছে। প্রায় একই সংখ্যক মানুষ মনে করেন, এই ব্যবধান কমাতে রাজ্য সরকারের আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। অধ্যাপক ট্রেব্বির মতে, প্রস্তাবটির পেছনে অভিজাত শ্রেণি ও বিদ্যমান ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা কাজ করছে। তাঁর ভাষায়, এর লক্ষ্য সম্পদ ও ক্ষমতার ভারসাম্য কিছুটা ফিরিয়ে আনা।

সম্পদ কর নিয়ে বিতর্ক কেবল ক্যালিফোর্নিয়ায় সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলের আরেক অঙ্গরাজ্য ওয়াশিংটনেও বছরে ১০ লাখ ডলারের বেশি আয়ের ওপর ৯ দশমিক ৯ শতাংশ কর আরোপের একটি প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে। ইউরোপে একসময় সম্পদ কর বেশ প্রচলিত থাকলেও বর্তমানে মাত্র কয়েকটি দেশে এ ব্যবস্থা চালু আছে। ইনস্টিটিউট অব ইকোনমিক অ্যাফেয়ার্সের রাজনৈতিক অর্থনীতি বিভাগের প্রধান ক্রিস্টিয়ান নিমিটজের মতে, সম্পদ কর প্রশাসনিক জটিলতা বাড়ায়, বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে, পুঁজি দেশান্তরের ঝুঁকি তৈরি করে এবং প্রত্যাশার তুলনায় কম রাজস্ব এনে দিতে পারে। নরওয়েতে সম্পদ কর বাড়ানোর পর ২০২২ সালে অতি-ধনী ব্যক্তিদের দেশ ছাড়ার সংখ্যা আগের ১৩ বছরের মোট সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে যায় বলে একটি স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। সুইজারল্যান্ড নিয়ে করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সম্পদ কর ০ দশমিক ১ শতাংশ পয়েন্ট বাড়ালে করযোগ্য সম্পদের পরিমাণ ৩ দশমিক ৫ শতাংশ কমে যায়।

ক্যালিফোর্নিয়ার ভোটারদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে, বিলিয়নেয়ারদের সম্পদে এককালীন কর আরোপ করে স্বাস্থ্যসেবা খাতের অর্থসংকট মোকাবিলার এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হবে কি না। প্রস্তাবটির সমর্থকেরা বলছেন, এটি সম্পদ বৈষম্য কমানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবায় অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করবে। অন্যদিকে বিরোধীদের আশঙ্কা, ধনীদের অঙ্গরাজ্য ছাড়ার প্রবণতা বাড়লে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি ও রাজস্ব আয় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।